প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
বিশ্ব নারী মুক্তির অগ্রদূত মেরিওল স্টোন ক্রাফট এক বিখ্যাত উক্তির মাধ্যমে নারীর স্বাধীনতাকে লালন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাধীনতাকে আমি দীর্ঘকাল ধরে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠধন, সবগুণের ভিত্তি বলে গণ্য করে আসছি। আমার সব চাওয়া সংকুচিত করে হলেও আমি নিশ্চিত করবো আমার স্বাধীনতাকে, যদি আমাকে উর্বর প্রান্তরে বসবাস করতে হয় তবুও’। মেরিওলের স্বাধীনতাকামী উক্তি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসাকে আরো সোচ্চার করে প্রতিবাদের ভাষা এখন প্রতিধ্বনিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিধ্বনি শুনি নারীর বলিষ্ঠ কণ্ঠে, নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন, নির্মমতা, নৃশংসতা নির্বিচার নয়। নারীও সমাজের একজন সম্মানিত স্বাধীন মানুষ। নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নারীর ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে নারীর স্বাধীন চলাফেরা ও বাক স্বাধীনতাকে। নারী-পুরুষ দুটি লিঙ্গের পার্থক্য থাকলেও মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে নেই কোন ভেদাভেদ। নারী-পুরুষ উভয়ই উভয়ের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব নারীর স্বাধীনতা রক্ষায় পুরুষের সহায়তার হাতকে প্রসারিত করে। আর মানুষ যদি জন্মগতভাবেই স্বাধীন হয় তাহলে নারী কেন হবে না স্বাধীনচেতা, স্বাধীনতাকামী, পরিশেষে স্বাধীন। মালালা ইউসুফজাই পাকিস্তানের সোয়াতে নারী শিক্ষার পক্ষে কাজ করায় এবং তালেবানের বিপক্ষে কথা বলায় ৯ অক্টোবর ২০১১ তারিখে তালেবানের গুলিতে আহত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার অনলাইনে এবং ডাকযোগে মালালাকে ‘হেরাল্ড পারসন অব দ্যা ইয়ার-২০১২’ নির্বাচিত করেন। মালালার পরে যে নিপীড়িত নারী বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছেন তিনি একজন ভারতীয়। ‘ভারতকন্যা’ খ্যাত এই নারী নামে ভারতে এখন যৌন নিপীড়নবিরোধী কঠোর আইন হতে যাচ্ছে। ভারতকন্যা বন্ধুকে নিয়ে বাসযোগে বাসায় ফেরার সময় নরপশুদের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ধর্ষণের পর দিল্লির মেডিক্যাল ছাত্রীর সাহসী ভূমিকার জন্য ভারত সরকার মেয়েটিকে ‘ভারতকন্যা’ হিসেবে ঘোষণা করে। ধর্ষকরা ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। তাদের বিচারকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। পাকিস্তান-ভারতের পর এবার ফিরে আসি দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ বাংলাদেশে। বাংলাদেশে টাঙ্গাইলে গণধর্ষণের শিকার নবম শ্রেণির ছাত্রীর প্রতিবাদী কণ্ঠের আওয়াজ ভারতকন্যার মতো বিস্তৃত হয়নি। ওই ছাত্রীর চিত্কার আঞ্চলিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ঢাকা পর্যন্ত গড়িয়েছে। মিছিল, মানববন্ধন আর প্রতিবাদের ভাষা বিশ্বজুড়ে পৌঁছায়নি। তবে প্রতিবাদের খুব কাছে বঙ্গবভনেও কী প্রতিবাদের আওয়াজ পৌঁছায়নি? স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা যেখানে জরুরি সেখানে সরকার কী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছেন? আমরা আতঙ্কে থাকি, আবার কোথায় কোন্ মেয়ে নরপশুদের শিকারে পরিণত হয়। সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিনই এ সম্পর্কিত খবর আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। সরকার যে এ ব্যাপারে নির্লিপ্ত সেটাও বলা যায় না। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। কঠোর হওয়ার প্রশ্নটি এ জন্য বলছি যে, প্রতিদিনই একাধিক কোনো না কোনো ধর্ষণের ঘটনা বের হয়ে আসছে, ধর্ষক শাস্তি পাচ্ছে ক’জন? জেল হচ্ছে কতোদিনের? আবার সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ থাকছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে । এর ফলে এত বড় অপরাধের ঘটনা থামছে না, বরং বাড়ছে। এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রথমে সরকারকেই কঠোর আইন করে অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বের করে নিয়ে আসতে হবে অপরাধীর আসল পরিচয়। তাদের জীবনযাপন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, চাহিদা প্রভৃতি। রক্ষা করতে হবে নারী-পুরুষের কাজের ভারসাম্য এবং তাদের নিয়ে কাউন্সিলিং করতে হবে। তবে সরকারকে এ অপরাধ দমনে সহায়তা করতে দেশের সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে। কেননা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার, জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করলে তবেই সে কাজের সফলতা আসে। সবাই অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুললে গণতন্ত্রের চর্চারও সঠিক মূল্যায়ন হয়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ সবাই অন্যায়কে রুখে দাঁড়াবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মাথাগুণে’ সুতরাং জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ সবার মাথাই আসবে। নারী-পুরুষ একতাবদ্ধ হয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলবে। নারী কখনো পুরুষকে বাদ দিয়ে তার স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করতে পারে না। মেরিওল স্টোনের স্বাধীনতাকামী উক্তি ধারণ করতে হবে সকলের হূদয়ে। মালালা, জ্যোতি, টাঙ্গাইলের নবম শ্রেণির ছাত্রীর প্রতিবাদকে সম্মান দিতে হবে। সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে ফরিদপুরের বালিকা বধূর প্রতিবাদ। ফরিদপুরের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রী তার অমতে স্বামী বনে যাওয়া ব্যক্তির হাত থেকে কীভাবে নিজেকে সে রক্ষা করেছে, সে সাহসিকতার কথা পৌঁছে দিতে হবে প্রান্তিক পর্যায়ে। নারীর স্বাধীনতায় নিজের বিবেক এবং সহমর্মিতাবোধ জাগ্রত করতে হবে। নারী স্বাধীনতার পথ আরো কীভাবে খুলে দেয়া যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। সর্বোপরি, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হূদয়ে গ্রোথিত করতে হবে। লেখক :বিদায়ী শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন