বলতে গেলে কলম হাতে লিখতে লিখতে, কথা বলতে বলতে ১৫ জানুয়ারি মঙ্গলবার আমাদের ছেড়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন তীক্ষ্ন, বুদ্ধিদীপ্ত, কাব্যিক গতিময় গদ্যের কারুশিল্পী বহুমাত্রিক লেখক আবদুশ শাকুর। অসুস্থতা অনুল্লেখ্য। বাহাত্তর বছর বয়সেও সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে তার বিচরণ ছিল সদম্ভ-স্বগর্ব। সমসাময়িক সৃজনশীল বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত জমিনে আবদুশ শাকুরের নানামুখি পদচারণা যেমন ছিল দৃপ্ত-সরস তেমনি স্বমহিমায় লক্ষণীয়ভাবে শক্তিশালী। সাম্প্রতিক সময়ে টিভি চ্যানেলের টকশো আর সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প-নিবন্ধ প্রকাশনায় তার সবল-সরব উপস্থিতি দেখে মনে করা গিয়েছিল তিনি মনে-প্রাণে তারুণ্যকে লালন করে চলেছেন সত্তরোর্ধ্ব বয়সেও। নোয়াখালীর সুধারাম থানার রামেশ্বরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীত বিদ্যায় অর্থ বিজ্ঞানী, এক সময়ের সরকারের সাচিবিক পেশার আমলা, আরবি-ফার্সি-উর্দু-ইংরেজি ভাষার সুপণ্ডিত—সব পরিচয়কে ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা কথাসাহিত্যের একনিষ্ঠ সেবক, সঙ্গীতগবেষক, গোলাপগবেষক, সঙ্গীতজ্ঞ-সঙ্গীতশিল্পী। জ্ঞান-মেধা-মননের যুগপত্ সমন্বয়ে সৃষ্ট তার লেখনি এক পরিশীলিত মাত্রায় উত্সারিত যা ভাষার স্বাতন্ত্র্যে প্রোজ্বলরূপে ধরা দেয় পাঠকের কাছে।
তার গোটা সাহিত্য-ভাবনা জুড়ে চিন্তা আর কল্পনাশক্তির চমত্কার বহমানতা লক্ষ্য করা যায়। ‘ভাষা ও সাহিত্য’, ‘মহান শ্রোতা’, ‘মহামহিম রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথকে যতটুকু জানি’ ইত্যাদির মতো প্রবন্ধ-গবেষণা গ্রন্থ থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র ধারার রম্য রচনা ‘চুয়াত্তরের কড়চা’, ‘মধ্যবিত্তের কড়চা’, আবদুশ শাকুরের কড়চা’,‘রম্য সমগ্র’ প্রভৃতির মতো গ্রন্থ এবং ‘ক্রাইসিস’, ‘সহে না চেতনা’, ‘উত্তর-দক্ষিণ সংলাপ’, ‘নিভৃতে যতনে’ ইত্যাদি উপন্যাস এবং ‘এপিটাফ’, ক্ষীয়মাণ’, ‘ধস’, ‘বিচলিত প্রার্থনা’, ‘নৈসর্গিক সম্পর্ক’, ‘গোলাপ ধোলাই’, ‘গল্প সমগ্র’, ‘আঘাত’, ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ ইত্যাদি গল্পগ্রন্থ; কিশোর গল্প— ‘আক্কেল গুড়ুম’; নাটক ‘ঝামেলা’, ‘টোটকা’ এবং সঙ্গীতবিষয়ক গ্রন্থ— ‘সঙ্গীত সংবিত্’, ‘সঙ্গীত সঙ্গীত’ আর গোলাপ বিষয়ক গবেষণামমূলক গ্রন্থ ‘গোলাপ সংগ্রহ’ আবদুশ শাকুরের অনবদ্য রচনা সমগ্র। তার আরো একটি বড় পরিচিতি তিনি দুই বাংলার রম্য লেখকদের মধ্যে অন্যতম। তার রম্য রচনা নিজস্বধারার সৃজনশীলতায় এতটাই সার্থক যে, খুব সহজেই তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। শুদ্ধ সঙ্গীতের সুর, স্বর, বাণীর ওপর জ্ঞানগর্ভ এবং গবেষণাধর্মী আলোচনা শুধু নয়, আবদুশ শাকুর একজন বিদগ্ধ সঙ্গীতশিল্পী হিসিবেও ছিলেন সবার কাছে সুপরিচিত। তার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং হারানো দিনের আধুনিক বাংলা গানের অডিও অ্যালবাম প্রচুর প্রকাশিত হয়েছে ওপার বাংলা থেকে। দুই বাংলার বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা সমৃদ্ধ করেছে তার প্রকাশিত বইয়ের ভাণ্ডারকে। সুখের কথা, তার কৃতকর্মের মূল্যায়ন হয়েছে দুই বাংলা থেকেই।
বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, অমিয়ভূষণ পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বইসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। আমরা তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক/অনুবাদক
