সরকার জ্বালানির দাম বাড়াইয়াছেন। এখন জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে যাহারা বা যেই সকল খাত এই দাম বৃদ্ধি দ্বারা প্রভাবিত হইবে তাহারা পণ্য বা সেবাসমূহের দাম বাড়াইতে চাহিবে তাহাই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া বৃদ্ধি করা হইয়াছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানায় পরিবহন মালিক সমিতি। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে পরিবহন ভাড়ার একটা ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় হইতেই পারে। তবে তাহার মাত্রা যেন অবশ্যই জ্বালানির দাম বৃদ্ধির হারের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। এই ধরনের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমরা চরম সামঞ্জস্যহীনতা দেখিয়াছি অতীতে। অতীতে সিএনজি’র ৫০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাস ভাড়ার হার ৩০ হইতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িতে দেখিয়াছি আমরা। এই ধরনের প্রতিক্রিয়া একেবারে অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বাস ভাড়া ৫ হইতে ১০ শতাংশের বেশি বাড়িতে পারে না। কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ ৫ হইতে ১০ শতাংশের বেশি বাড়িতে পারে না। পরিবহন ভাড়া বাড়াইতে হইবে শুধুমাত্র বর্ধিত খরচ মিটাইবার জন্য। জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করিয়া পরিবহন খাত হইতে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরির জন্য নয়। কিন্তু বার বার এই ধরনের অপকৌশলের ব্যবহার লক্ষ্য করা গিয়াছে আমাদের পরিবহন খাতে।
অর্থনীতিবিদরা পরিবহন খরচ নিয়া যে গবেষণা করিয়াছেন সেখানে বাস/ট্রাক এর মত পরিবহনের ক্ষেত্রে মোট খরচের ১০ হইতে ২০ শতাংশ যায় ফুয়েল বা জ্বালানির খরচ হিসাবে। বাকি ৮০ হইতে ৯০ শতাংশ যায় অন্যান্য খরচ বাবত যাহার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল বাস কিংবা ট্রাক কিনিবার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচালন ব্যয় প্রভৃতি। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে শুধু ঐ জ্বালানির খরচের ১০/২০ শতাংশের পরিবর্তন হয়। জ্বালানির দাম একশত ভাগ বাড়িয়া গেলে জ্বালানির খরচের অংশ দিগুণ হইয়া যাইবে। কিন্তু জ্বালানির বাহিরের অন্যান্য খরচ তো প্রায় একই থাকিবার কথা। ফলে জ্বালানির দাম একশত ভাগ বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া ১০/২০ ভাগ বাড়া যৌক্তিক। তেমনিভাবে, জ্বালানির দাম পঞ্চাশ ভাগ বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া তাহার অর্ধেক অর্থাত্ ৫/১০ ভাগ বাড়া যৌক্তিক। কিন্তু তাহা যখন ৩০ হইতে ৪০ শতাংশ বাড়িয়া যায় তখন ইহাকে কোনভাবেই যৌক্তিক হিসাবে মানিয়া নেওয়া যায় না। মোটকথা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের সময় অস্বাভাবিক রকমের ঊর্ধ্বমুখী সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। কোন একটা খাতে ইহা সম্ভব হয় তখনই যখন সেই খাতে প্রতিযোগিতার অভাব থাকে কিংবা কোন ধরনের সিন্ডিকেট থাকে। আশা করি আমাদের পরিবহন খাতে এই ধরনের সিন্ডিকেট নাই। সেই জন্য এই খাতের ভাড়ার যৌক্তিক সমন্বয় আশা করিতেছি।
বর্তমানে অকটেন-এর দাম ৫ শতাংশের মত বাড়িয়াছে। ফলে অকটেন ব্যবহারকারী পরিবহনের ভাড়া এক শতাংশের বেশি বাড়া উচিত নয়। মূল্যস্ফীতি ধর্তব্যে আনিলে, পরিবহন খরচের অন্যান্য আইটেমের কথা চিন্তা করিয়া আরও কয়েক শতাংশ বাড়াইতে পারে। কিন্তু সর্বসাকুল্যে ৫ শতাংশের বেশি নয়। এইভাবে জ্বালানির অন্যান্য আইটেমের দাম বৃদ্ধির জন্যেও সংশ্লিষ্ট পরিবহন ভাড়া সমন্বয় করা যাইতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বাস ভাড়ার সমন্বয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখিবেন, যাহাতে অযৌক্তিক কোন বৃদ্ধি মানিয়া না নিতে হয়। মনে রাখিতে হইবে, পরিবহন ভাড়া বাড়িলে তাহার পরোক্ষ প্রভাব উচ্চ দ্রব্যমূল্যের মধ্য দিয়া আমাদের উপর আসিয়া পড়ে, যাহা অনেক বড়।
