রিতু ও রাব্বি। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে জন্ম নেয়া দু’টি শিশুর নাম। দু’জনে একই বছর জন্মেছিল। আজ থেকে দশ বছর আগে। গণতন্ত্রের রিতুকে পাওয়া গেছে একটি বহুতল ভবনের শৌচাগার থেকে। তবে জীবিত নয়; রক্তাক্ত ও অর্ধগলিত অবস্থায়। পিতৃহারা এই শিশুটি তার শ্রমজীবী মাকে সাহায্য করতে সেদিন একটি বহুতল ভবনে গিয়েছিল। মা ঐ ভবনের পিয়ন-দারোয়ানদের নিকট টিফিন বাটিতে করে ভাত-তরকারি বিক্রি করেন। মায়ের রেখে আসা বাটিগুলো নিয়ে আসতেই রিতু ঐ ভবনে গিয়েছিল। আর খোঁজ নেই। রিতুর মা থানায় গেলেন, পত্রিকায় খবর ছাপালেন, এলাকায় মাইকিং করার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু কেউ রিতুর খবর দিতে পারল না। পাঁচদিন পর মা রিতুকে খুঁজে পেলেন। ততক্ষণে ধর্ষকের নখের আঁচড়ে ছোট্ট রিতুর দেহ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। শরীর থেকে অর্ধগলিত মাংসগুলো যেন খসে পড়ছে। রিতুর মা পল্টনের রাজপথ ধরে চিত্কার করছেন। যে রাজপথ প্রতিদিন কম্পিত হয় আমাদের গণতন্ত্রের রাজনৈতিক দলগুলোর হুংকারে, সে রাজপথই আজ আবার প্রকম্পিত হচ্ছে এক ধর্ষিতার মায়ের আহাজারিতে।
রিতুরা সেগুনবাগিচায় থাকে। এর এক পাশে নয়াপল্টন, যেখানে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রধান বিরোধী দলের অফিস। অন্য পাশে পল্টন, গুলিস্তান, যেখানে সরকারি দলের অফিস। রিতুর মৃত্যুতে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছে। সেগুনবাগিচার মানুষ ফুঁসে উঠেছে। কিন্তু রিতুর মায়ের আহাজারি কি দু’পাশের দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের অফিসকে প্রকম্পিত করতে পেরেছে? বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জবাবদিহিতার চরিত্র এখানেই পরস্ফুিটিত। দশ বছরের ধর্ষিতা শিশুর গলিত লাশ সেগুনবাগিচার সাধারণ মানুষের হূদয়কে ছুঁতে পারলেও সরকারি ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে স্পর্শ করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটি দশ বছরের ধর্ষিতা শিশুর গলিত লাশ পাওয়া যাবে আর সরকার ও ছায়া সরকারের কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না সেটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারে না।
দশ বছরের শিশু রাব্বি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ধরে হেঁটে চলছিল। গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতির বুলেট ঝাঁঝরা করে দিয়েছে তার বুক। দরিদ্র টেম্পু চালকের সন্তান ছোট্ট রাব্বি রক্তাক্ত। রাজনীতি বা বুলেট কোনোটি বোঝার আগেই রাব্বির শরীর থেকে এই রাজনীতি আর বুলেট রক্ত ঝরাচ্ছে। রাব্বি জানত না বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বুলেট থাকে। সেখানেও সৈনিকরা থাকেন। যুদ্ধ হয় সেখানেও। নিশ্চয়ই সে জানত না। জানার বয়সও হয়নি। কিন্তু হায়রে বুলেট। সে কি আর বয়স চিনে। ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের যুদ্ধের মাঝে রাব্বি পড়ে গেছে। সে তো কৌশল জানে না। ঐতিহ্যবাহী ছাত্র রাজনীতির বুলেট তার বুকেই বিঁধল। গণতান্ত্রিক রাজনীতির নিয়োগ বাণিজ্যের জন্য রাব্বিকে জীবন দিতে হলো।
রিতু ও রাব্বি আজ ইতিহাস। একজন পৈশাচিক পুরুষত্বের শিকার এবং অন্যজন পৈশাচিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির শিকার। দিল্লির ঘটনার পর প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কোনো কোনো কন্যা শিশুর কান্নায় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাশ ভারি হয়ে যায়। ৫ জানুয়ারি মিরপুরে পাওয়া যায় ধর্ষিতা শিশু ফারজানার লাশ। ১৩ জানুয়ারি রাজবাড়ীতে পাওয়া যায় মাত্র পাঁচ বছরের শিশুর ধর্ষিত লাশ। পাশাপাশি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শুয়ে আছেন এসিডদগ্ধ ইডেন কলেজের ছাত্রী। প্রতিদিনের খবরের কাগজ দেখলে মনে হয় বাংলাদেশ যেন কিছু নষ্ট পুরুষের একটি ধর্ষকপুরী। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে পাঁচ বছরের, দশ বছরের শিশুরা প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হবে আর সরকার ও বিরোধী দল ক্ষমতার মসনদ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এই গণতন্ত্রই কি জনগণ চেয়েছিল? কত কিছুর জন্যই বিরোধী দলগুলো কর্মসূচি দেয়; কিন্তু ধর্ষকদের প্রতিরোধে বিরোধী দলগুলোর বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই। শিক্ষকদের আন্দোলন স্তব্ধ করতে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের রুদ্ধ করতে সরকার পিপার সেপ্র থেকে শুরু করে কত কৌশলেরই না আশ্রয় নিচ্ছে: কিন্তু ধর্ষকদের হাত থেকে আমাদের বোনদের রক্ষা করতে সরকারের বিশেষ কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। একটি রাজনৈতিক দলের মহাসচিবকে আটক রাখতে সরকারের মামলার অভাব হয় না; কিন্তু রাজবাড়ীর পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টাকারী আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়। এই হলো আইনের শাসন। অথচ আইনের শাসনই হলো গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্বে ছাত্র রাজনীতির সুমহান ঐতিহ্য ছিল। আর এখন ছাত্র রাজনীতি মানেই তাণ্ডব আর উচ্ছৃঙ্খলতা। এই তাণ্ডব ও উচ্ছৃঙ্খলের পুরোভাগেই থাকে প্রতিটি সরকারের ছত্রছায়ায় তার ছাত্র সংগঠন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটি জাহাঙ্গীরনগরে নিজ দলের কর্মীকে খুন করলো, সিলেটে এমসি কলেজের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাস পুড়িয়ে দিল। সবশেষে ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিল শিশু রাব্বির মৃত্যু। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি শিশু রাব্বির জীবন কেড়ে নিল। এই কি গণতন্ত্র?
বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে অনেকেই আশাবাদী। আমিও হতাশ নই। যে গণতন্ত্রে দশ বছরের রিতু, ফারজানা আর রাব্বিরা নিরাপদ নয়, সেই গণতন্ত্র দিয়ে সাধারণ জনগণের লাভ কি? ছাত্র রাজনীতি দরিদ্র বিশ্বজিেক হত্যা করলো। এবার তার বলি হয়েছে টেম্পো চালকের দশ বছরের শিশু সন্তান। যারা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিষয় অতিশয় আশাবাদী তাদের বলতে চাই গণতন্ত্রের বাইশ বছর পর একটি দশ বছরের শিশু যখন ছাত্র রাজনীতির বলি হয় তখন তাকে কিভাবে অগ্রগতি বলা যায়? ২২ বছর পূর্বে তো কোনো ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কারণে ১০ বছরের শিশুর মৃত্যু হয়নি। সাবাস! অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে কত শিশু ক্রসফায়ারে পড়বে তার হিসেব ভবিষ্যতের গণতন্ত্রপন্থিরাই করবেন। ধর্ষণ চেষ্টাকারী সকল তরুণ জামিনে মুক্তি পেতে থাকলে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের কন্যা শিশুদের আর রক্ষা নেই।
গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য কিছু আবশ্যক শর্ত রয়েছে। তন্মধ্যে কার্যকর সুশীল সমাজ অন্যতম। গণতন্ত্রের ক্রান্তিকালে এই সুশীল সমাজ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কার্যকর করতে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। বাংলাদেশে সুশীল সমাজের বেশিরভাগ অংশই নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। দ্বিতীয় শর্ত হলো, একটি জটিল নাগরিক সমাজ। যে নাগরিক সমাজ পুরো সমাজে নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণে কাজ করবে। এই ধরনের নাগরিক সমাজের বিকাশ এখনো বাংলাদেশে হয়নি। গণতন্ত্রের সাফল্যের সর্বশেষ শর্তটি হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনের মধ্যে। যে পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র তার সকল নাগরিকের নিকট জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। বাংলাদেশে যখন ধর্ষক জামিনে মুক্তি পায়, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে পেটালে পুলিশ পুরস্কার পায়, ভিন্নমত দমনে পিপার সেপ্র ব্যবহার করা হয়, তখন এই রাষ্ট্র যে জবাবদিহিতার চরিত্র ধারণ করতে পারেনি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের এই যে চরিত্র তাতে রিতু, রাব্বি ও ফারজানাদের লাশের মিছিল বেড়েই চলবে। বাতাসে শুধু লাশের গন্ধ পাওয়া যাবে। নাগরিকগণ পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের আশায় বুক বাঁধবে।
লেখক:শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]
