গাজীপুরে এইসব কী হইতেছে? মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশ-আনসারের উপস্থিতিতে নির্দয়ভাবে প্রকাশ্যে পিটাইয়া হত্যা করা হইল তিনটি মানুষকে—অথচ নিরাপত্তা বা প্রতিকার দূরে থাকুক, সামান্য সহানভূতিটুকুও জুটিল না তাহাদের ভাগ্যে? প্রথম ভিকটিম ছিলেন মর্জিনা নামের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মধ্যবয়সী একজন নারী। অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য যে, প্রকাশ্য দিবালোকে অসংখ্য মানুষের চোখের সামনে কথিত ‘উন্মত্ত জনতা’ অসহায় এই নারীটিকে কেবল পিটাইয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গলায় বাঁশ চাপিয়া ধরিয়া মৃত্যুও নিশ্চিত করা হইয়াছে তাহার। আরও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হইল, সবই ঘটিয়াছে পুলিশের উপস্থিতিতে। জানা যায়, সহূদয় কয়েকজন ব্যক্তি আহত নারীটিকে উদ্ধার করিয়া নিরাপত্তার জন্য পুলিশের হাতে তুলিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু ন্যূনতম নিরাপত্তাটুকু জোটে নাই সেই নারীর ভাগ্যে। বরং স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির একজন এসআই এই মর্মে অজুহাত দেখাইয়াছেন যে, তাহারা উপস্থিত থাকিলেও ‘এলাকাবাসীর উত্তেজনার কারণে’ কিছুই করিতে পারেন নাই। ছেলেধরা সন্দেহে পিটাইয়া মারা এই নারীটির বাড়িওয়ালা এবং প্রতিবেশিরা একবাক্যেই বলিয়াছেন যে, এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নাই।
পৈশাচিক এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত শনিবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায়। মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে, গত সোমবার গাজীপুর সদর উপজেলার কোনাবাড়ী এলাকায় ততোধিক নৃশংসতার সাথে হত্যা করা হয় অজ্ঞাতনামা আরও দুই ব্যক্তিকে। তন্মধ্যে একজন নারী। পিটাইয়া হত্যার পর আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয় তাহার শরীরে। ঘটনাস্থলে তখন বেশ কয়েকজন আনসার সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাহাদের একজন বলিয়াছেন, ‘শত শত লোক ওই নারীকে পিটাইয়া হত্যা করিয়া তাহার শরীরে আগুন ধরাইয়া দেয়। আমরা লোকজনকে সরানোর চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইয়াছি।’ কাকতালীয়ভাবে আনসারের কণ্ঠেও পুলিশের বক্তব্যই প্রতিধ্বনিত হইয়াছে। ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে হতভাগ্য মানুষগুলিকে পিটাইয়া হত্যা করা হইলেও স্থানীয় প্রশাসন বলিয়াছে যে, ছেলেধরা বলিতে কিছুই নাই, পুরোটাই গুজব। আমাদের প্রশ্ন ও হতাশা এইখানেই। গাজীপুরের মতো ছোট্ট একটি জেলায় ভিত্তিহীন একটি গুজবের উপর ভিত্তি করিয়া টানা তিনদিন ধরিয়া প্রকাশ্যে পৈশাচিকভাবে মানুষ হত্যার মতো উন্মত্ততা কিভাবে চলিতে পারে তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম।
আমাদের দেশে পিটাইয়া হত্যার ঘটনা নূতন নহে। দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে প্রায়শ এই ধরনের দুঃখজনক ঘটনার খবর পাওয়া যায়। কারণে-অকারণে পিটাইয়া হত্যার উদাহরণ ভূরি ভূরি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মরিয়াও রক্ষা পান না। তাহাদের গায়ে ডাকাত, দুর্বৃত্ত, ছিনতাইকারী প্রভৃতি তকমা লাগাইয়া দেওয়া হয়। আমিনবাজারের ঘটনাটিই ইহার উত্কৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে উত্থাপিত হইতে পারে। শবেবরাতের রাত্রে কিশোর-উত্তীর্ণ ৬ ছাত্রকে নির্দয়ভাবে পিটাইয়া হত্যা করা হয়। সেইখানেও পুলিশ উপস্থিত ছিল। কিন্তু তাঁহারা আক্রান্তদের বাঁচাইবার কোনো চেষ্টাই করেন নাই। বরং পুলিশের সহায়তায় দায়ী ব্যক্তিরাই বাদী হইয়া নিহত ছাত্রদের বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা দিয়াছিল। বিলম্বে হইলেও সেই সত্য উদ্ঘাটিত হইয়াছে। কিন্তু সেই ঘটনা হইতে কেহ শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। গাজীপুরের ক্ষেত্রে ঠিক কী ঘটিয়াছে আমরা জানি না। তবে একসাথে এতোগুলি মানুষ কেন হঠাত্ করিয়া এইভাবে উন্মত্ত হইয়া উঠিল— তাহা অবশ্যই খতাইয়া দেখা দরকার। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে যে, পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়া না গেলে এ দেশের মানুষ সচরাচর আইন নিজের হাতে তুলিয়া নেয় না। সামগ্রিকভাবে দেশের আইন-শৃৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে খুব একটা স্বস্তিকর নহে— তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিছু লোক ধরাকে সরাজ্ঞান করিতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনকে তাহার স্বাভাবিক গতিতে চলিতে দেওয়া হইতেছে না। ফলে ভুক্তভোগী মানুষের মধ্যে অসহিষ্ণুতার মাত্রা বাড়িয়াই চলিয়াছে। গাজীপুরের অবস্থাও ভিন্ন হইবার কোনো কারণ নাই। এই অবস্থা হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলে আইনকে অবশ্যই স্বাভাবিক গতিতে চলিতে দিতে হইবে। আইন অমান্যকারীরা যতো শক্তিশালীই হউক না কেন তাহাদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করিতে হইবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।
