আলোকপাত

ভাষাবিজ্ঞানী জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৩
বাংলা ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে যাদের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে স্যার আব্রাহাম গ্রিয়ারসনের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়। তিনি বাঙালি ছিলেন না; ছিলেন একজন ইংরেজ। চাকরি সূত্রে তিনি ভারতে এসেছিলেন। মনেপ্রাণে বাংলা ভাষার অবগাহনে ছিলেন সিক্ত। ভাষার দরদ যে মায়ের দরদের মত, তা তিনি উপলব্ধি করেন। বাংলা ভাষা চর্চায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন জীবনভর। তাই চাকরি করে নিজের জীবনকে ভোগ-বিলাসে ভাসিয়ে না দিয়ে তিনি ভারতীয় ভাষার পরম বন্ধু হয়ে গেলেন। ভারতীয় ভাষা গবেষণায় নিজেকে নিয়োগ করলেন। তিনি বাংলা ভাষার নতুন দিগন্তের সূচনা করলেন। কেবল তাই নয়, উনবিংশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত বাংলা উপভাষাতত্ত্বের ব্যাপারে তেমন কোন ধারণা ছিল না ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে। ভাষার সংগঠন ও গঠন আলোচনায় প্রবৃত্ত ছিলেন ভাষাবিজ্ঞানীগণ। ভাষাতত্ত্বের তাত্ত্বিক আলোচনায়ই তারা অধিক সময় ব্যয় করেছেন। ভাষাবিজ্ঞানের যে প্রায়োগিক দিক খুবই গুরুত্ববহ এবং এতেই ভাষাবিজ্ঞান চর্চার সাফল্য নিহিত সে ধারণায় তারা বিশ্বাসী ছিলেন না বললেই চলে। এ কারণে যে উপভাষা ভাষার প্রাণ বলে বিবেচিত তা সাদরে আদৃত হয়নি তাদের কাছে। ভারতীয় উপমহাদেশে উপভাষাতত্ত্বকে পরিচিত করে তুলেন স্যার আব্রাহাম গ্রিয়ারসন। উপভাষাতত্ত্বে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ফরাসীরা; আর আঞ্চলিক ভাষাতত্ত্বে ইতালিয়ানদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভাষার উপভাষা- মানচিত্র প্রথম প্রণয়ন করেন জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ জর্জ ওয়েংকার। অন্যদিকে ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোল শাস্ত্রের উদ্ভাবক হলেন ফরাসি পণ্ডিত জুল গিলিয়েগা। তিনি ফরাসি উপভাষা জরিপে দুই হাজার প্রশ্নসম্বলিত একটি প্রশ্নমালা ব্যবহার করেন। বিংশ শতকের শুরুতে এ কাজ আরম্ভ হয়ে তা বই আকারে বের হয় ১৯১২ সালের দিকে। জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন ঠিক ঐ সময়েই ভারতীয় অঞ্চলের উপভাষা জরিপের কাজটি সম্পন্ন করেন। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯২৮ সালের মধ্যে তা প্রকাশিত হয় Linguistic Survey of India নামে। এতে বাংলা ভাষার উপভাষার আলোচনা আছে ৫ম খণ্ডের প্রথম ভাগে। এ জরিপের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় ভাষার বংশ পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, ভাষাভাষীর এলাকা চিহ্নিত করা, ভাষার সমস্যা বা লক্ষণ ভিত্তিতে ভাষাকে শ্রেণিবদ্ধকরণের মাধ্যমে ভারতীয় ভাষা গবেষণার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেন। জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন তার এই আকর গ্রন্থ প্রকাশের আগে বাংলা ভাষায় সম্পন্ন কোন কাজের নিদর্শন পাননি। নিজের মত করে তিনি তার কাজ সম্পাদনে প্রয়াসী হয়েছেন। একটি প্রচলিত লোককাহিনী বা গল্পের সাধু ভাষায় লিখিতরূপ বিভিন্ন স্কুল শিক্ষকদের কাছে প্রেরণ করেন, তারা নিজ নিজ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় গল্পটি রূপান্তরিত করে ফেরত পাঠান। পরবর্তীকালে তিনি সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে বিচার-বিশ্লেষণ করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি বর্তমানে ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, পাঠকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এ গ্রন্থের ধারণা থেকেই প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন করেন। কিন্তু জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসনকে যেভাবে স্মরণ করা উচিত সে ধরনের কোন উদ্যোগ দুই বাংলার কোথাও লক্ষ্য করা যায় না। ৭ জানুয়ারি ছিল এই কীর্তিমান মানুষের জন্মদিন। জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ারসন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে- কারণ কীর্তিমানের তো মৃত্যু নেই। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন