সবই কি ভাঁওতাবাজির রাজনীতি

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০১
দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ আর অসত্ ব্যবসায়ীরা দেশটা ধ্বংস করিয়াছে। এই কথা বলিয়াছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গত রবিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত পল্লী চিকিত্সকদের এক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণে সখেদে তিনি আরও বলেন, সব ভাঁওতাবাজির রাজনীতি। এইখানে গণতন্ত্র টিকিতে পারে না। ড. হোসেনের বক্তব্য কোনো তাত্পর্য বহন করে না, এমন কথা বলিবার অবকাশ নাই। কেননা, তিনি কোনো সাধারণ নাম-গোত্রহীন রাজনীতিবিদ নহেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁহার উজ্জ্বল ও অমোচনীয় অবস্থান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত অনুসারী হিসাবে বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামে তিনি পালন করিয়াছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাহাত্তরের সংবিধানের তিনি অন্যতম প্রণেতা এবং একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ। দেশের মূল ও প্রধান ধারার রাজনীতি হইতে ছিটকাইয়া পড়িলেও তাঁহার ব্যক্তিত্ব ম্লান হইয়া যায় নাই। তাহার পাণ্ডিত্য ও বৈদগ্ধ অনস্বীকার্য। তাঁহার মত একজন ব্যক্তি কোনো বিষয়ে দায়িত্বহীন মেঠো বক্তব্য দিবেন, তেমনটি কেহ আশা করে না। কিন্তু গত রবিবার পল্লী চিকিত্সকদের উদ্দেশে দেশের চলমান রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে তিনি যাহা বলিলেন, তাহাকে সুচিন্তিত বক্তব্য বলা যায় না। প্রথম কথা হইল, বাংলাদেশ ধ্বংস হইয়া যায় নাই, আকাশও ভাঙ্গিয়া পড়ে নাই কাহারো মাথায়। সত্য বটে, আমরা যেরূপ আশা করিয়াছিলাম, বুকভরা যে স্বপ্ন লইয়া স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করিয়াছি তাহা স্বাধীনতার পর চার দশকেও বহুলাংশে অপূর্ণই রহিয়া গিয়াছে। ইহার মানে এই নয় যে, দেশ গোল্লায় গিয়াছে কিংবা ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। আর যেইটুকু অনার্জিত রহিয়া গিয়াছে, তাহার জন্য কেবল রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরাই দায়ী, তেমনটি বলিবার কোনো সুযোগ নাই। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সকলেই দুর্নীতিগ্রস্ত বা অসাধু, তাহাইবা বলিতে পারা যায় কেমন করিয়া! দেশে রাজনীতির নামে যাহা চলিতেছে তাহার সবই ভাঁওতাবাজি, সেই বা কেমন কথা! ড. কামাল হোসেন নিজেও একজন রাজনীতিবিদ। এখনও তিনি রাজনীতির মধ্যেই আছেন। তিনি একটি দলের সভাপতি এবং সেই দল লইয়াই তিনি অন্য একটি দলের প্রধান সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বি চৌধুরীর সঙ্গে জোট বাঁধিয়াছেন। প্রধান দুই জোটের বাহিরে নূতন রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করিয়া যাইতেছেন। বিলক্ষণ ইহাও রাজনীতি। সবই যদি ভাঁওতাবাজির রাজনীতি হইয়া থাকে, তাহা হইলে ড. কামাল হোসেনের রাজনীতিও একই জিনিস নয় বলিয়া দাবি করিবার জায়গা কোথায়! উপসংহারে বলিবার কথা এই যে, কোনো বিষয়েই চরম কথাটি বলিয়া দেওয়া ঠিক নহে। যুক্তির ধার যাহাদের ধারিতে হয় না তাহারা চরম ও গরম কথা আকছার বলিয়া যাইতে পারেন। রাজনৈতিক পরিভাষায় সেইগুলিকে বলা হয় মেঠো বক্তৃতা। সকলের জন্য উহা শোভন নহে। ভাল-মন্দ কমবেশি সকল ক্ষেত্রেই আছে। রাজনীতিবিদরা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নহেন। তাহাদের মধ্যে যেমন ভুল পথের পথিক আছেন, তেমনই আছেন বহু সজ্জন ব্যক্তি। কৌশলে ভুল হয়, কাজ করিতে গিয়া ভুল হইয়া যাওয়াও বিচিত্র নয়। তেমনই সব ব্যবসায়ী অসত্ নহেন। সাধু অসাধু দুই-ই আছে। অনুরূপভাবে দেশ-কালের অন্য সকল পেশায় ভাল ও মন্দ আছেন। কাজেই সরলিকরণ বা সাধারণিকরণ মোটেও সুবিবেচনার কাজ নয়। কাজেই যাহা কিছু আমাদের অনার্জিত রহিয়া গিয়াছে এবং যাহা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত তাহার সব কিছুর জন্য শুধু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা দায়ী হইতে পারেন না। বস্তুতপক্ষে এই দায় কমবেশি সকলের। তবে যাহারা দেশ ও সমাজকে বিরাজনীতিকীকরণ করিতে চাহেন, তাহারা যে কোনো ছলছুতায় রাজনীতিবিদদের দোষারোপ করিতে মুখাইয়া থাকেন। তাহাদের চরিত্রহনন করেন। এই দেশে বহুবার অরাজনৈতিক মহল ক্ষমতা কুক্ষিগত করিয়াছে। আর যখনই সেইরূপ ঘটিয়াছে তখনই দেখা গিয়াছে রাজনীতিকগণের চরিত্র হননের মহোত্সব। সময়ান্তরে দেখা গিয়াছে সেই রাজনীতিবিদদের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া অরাজনৈতিক কেহ সুবিধা করিতে পারেন না। অর্থাত্ ঘুরিয়াফিরিয়া তাহাদের রাজনীতিকগণের শরণাপন্ন হইতে হয়। তবুও অজুহাত তৈয়ারির জন্য রাজনীতিকদের ভাবমূর্তি নস্যাতের চেষ্টা করা হয়। ড. কামাল হোসেনও রাজনীতিবিদগণের চরিত্র হনন করিবেন তাহা প্রত্যাশিত নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন