‘আমি অভাবের কারণে আমার ১৫ দিনের শিশু কন্যাকে বিক্রি করে ফেলেছি, আমি তাকে ফেরত পেতে চাই।’ উক্তিটি এশিয়া নিউজকে দেয়া ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কান্নারত আনজুমান আরা বেগমের। দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে নিপতিত হয়ে মাত্র ৮ হাজার টাকায় নিজের নাড়ি ছেঁড়া ধনকে তারই গ্রামের এক সন্তানহীন দম্পত্তির কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি। এ রকম হাজারো আনজুমান আরা বেগম আছেন আমাদের দেশে। ক্ষুধার্ত, গৃহহীন, আশ্রয়হীন, বস্ত্রহীন মানুষের আর্তনাদ প্রতিনিয়তই ভারী করে তোলে বাংলার আকাশ-বাতাস। আজকের এই কথিত ডিজিটাল বাংলাদেশের কোথায় নেই ছিন্নমূল মানুষের পদচারণা?
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (FAO) রিপোর্ট অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, যাদের ২০ শতাংশ আবার অতি দরিদ্র। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর তথ্য মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের ১৮তম ক্ষুধার্ত দেশ। ২৮.২ মিলিয়ন লোক ১৮০৫ কিলোক্যালরির কম খাবার খেয়ে জীবন-যাপন করেন। ২০১১ সালের ৪ অক্টোবরে ঢাকায় IFPRI আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা বলেন যে, বাংলাদেশে এখনো ৫০ মিলিয়ন লোক অতি দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে এবং ৩৬ মিলিয়ন লোক অনাহারে-অর্ধাহারে রাত কাটায়। ডব্লিউএফপি (WFP)-এর ২০১১ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যার দিক থেকে ভারত ও চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।
এখন প্রশ্ন হল—কেন এই ক্ষুধা ও দারিদ্র্য? ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের পেছনে বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ যেমন:বন্যা, খরা ইত্যাদি রয়েছে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যে কারণটা সবচেয়ে বেশি দায়ী তা হল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপাদানসমূহ যা উত্পাদন ও বণ্টন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসমতা প্রকট। এর নেপথ্যে যে দানবটি রসদ সরবরাহ করছে তা হল দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষ।
দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের উত্থান-পতন একই সাথে হয়। এদের মাঝে সমমুখী সম্পর্ক বিদ্যমান। আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশ দারিদ্র্যে জর্জরিত কারণ তারা বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার পশ্চিম ইউরোপের স্ক্যানডেনিভিয়ান দেশগুলোয় দরিদ্র কম কারণ তারা কম দুর্নীতিগ্রস্ত। এর অর্থ এই নয় যে, এর কোন ব্যতিক্রম নেই। বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা অনেক বেশি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI)-এ ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে টানা ৪বার চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। ক্রমান্বয়ে এ প্রবণতা কিছুটা কমে ২০১১ সালে ১৩তম অবস্থানে আসলেও দুর্নীতির সাম্প্রতিক প্রবণতা পুনরায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
হলমার্কের দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা, ডেসটিনির ৫ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি এবং পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তারই কয়েকটি নমুনা মাত্র। পদ্মা সেতু হলে ১৬ জেলার ৬ কোটি মানুষ সরাসরি উপকার পাবে। সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলার সাথে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) বাড়বে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর সারা দেশের জিডিপি বাড়বে ৬ শতাংশ। কিন্তু শুধুমাত্র দুর্নীতির অভিযোগের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য।
দুর্নীতি আয় বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। দুর্নীতিবাজ যে কেউ হতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির কালো থাবার শিকার হয় শুধুমাত্র সাধারণ গরীব মানুষ। হাসপাতালে একটি সেবা গ্রহণের জন্য একজন দিনমজুরকে ৫০ টাকা ঘুষ দিতে হলে ঘুষ গ্রহীতার কাছে এটা খুবই স্বল্প পরিমাণ। কিন্তু সে কি জানে আজকে সেবা গ্রহণের পর রাতে তাকে অনাহারে থাকতে হবে? কারণ ১ মার্কিন ডলারের নিচে তাকে জীবন নির্বাহ করতে হবে। অন্যদিকে একজন ব্যবসায়ী কালেকটরকে ৫০০০ টাকা ঘুষ দিলে এর বিনিময়ে সে ৫ লাখ টাকার কর ফাঁকি দিতে পারে!
যে দেশে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কারণে মা তার বুকের ধনকে বিক্রি করতে বাধ্য হন; অসহায় মানুষেরা চিকিত্সার অভাবে বিছানায় কাতরাতে থাকে মাসের পর মাস বছরের পর বছর; অপুষ্টির শিকার শিশুরা দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত হতে পারছে না; উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে; শীতের প্রকোপে বস্ত্রের অভাবে অসহ্য যন্ত্রণায় রাত কাটে লাখো মানুষের; ক্ষুধার তাড়নায় পতিতাবৃত্তির মত ঘৃণিত পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয় মা-বোনেরা, সে দেশে কিছু মানুষরূপী জানোয়ার তাদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এই অসহায় মানুষদেরই সম্পদ আত্মসাত্ করে তাদেরকে ক্ষুধার্ত রেখে শিকড় গেড়ে বসে আছে সমাজের উঁচু স্তরে।
এরা মানবতার শত্রু; এদের অন্তর পশুত্বের ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। ধিক্কার জানাই এদের। এদেরকে প্রতিহত না করে যত বড়ই উন্নয়ন পরিকল্পনা গৃহীত হোক না কেন তা ভেস্তে যাবে। আমরা জানি, একজন ক্ষুধার্ত মানুষ মানে একজন রাগান্বিত মানুষ। যদি বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত মানুষগুলো রেগে যায় তাহলে বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়া দুর্নীতিবাজরা পালানোর পথ খুঁজে পাবেন না। তাই আগে ক্ষুধার্তদের খেতে দিন পরে বিলাসিতা করুন।
লেখক : শিক্ষার্থী, ৪র্থ বর্ষ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, মাস্টারদা সূর্যসেন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
