রিচার্ড এটনবরোর গান্ধী ছবিটা বড় মনোযোগে দেখেছি। তার বিভিন্ন পরতের মোচন উন্মোচন করে বিভিন্ন চরিত্র সম্পর্কে শ্রবণপঠন যুক্ত করেছি, মিলিয়ে নিতে চেয়েছি। যেমন-এই তাহলে মওলানা আবুল কালাম আজাদ! শিক্ষামন্ত্রী! যিনি ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রীডম’ লিখেছিলেন! বইয়ের ত্রিশ পৃষ্ঠা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দিনের আলো না দেখানোর জন্য যিনি আইনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
যেমন-গান্ধীজী তাহলে অনশন ভাঙ্গার সময় নেহরু-প্যাটেল এদের কারও হাত থেকে জল গ্রহণ করেননি। বেছে নিয়েছিলেন তাহলে ভিনবিশ্বাসের আবুল কালাম আজাদকে! বর্ণ হিন্দুদের পক্ষে লবেজান নেমে পড়া ব্রাহ্মণজাত নাথুরাম কি তাহলে বাপুজীর অনশনক্লান্ত দেহটাই বেছে নিয়েছিল তার ‘পবিত্র দায়িত্ব’ পালনের জন্য! এত অন্ধ, ইডিয়ট, বিদ্বিষ্ট, ব্রেইনওয়াশড আর কালপ্রিট-ক্রিমিনাল আর অবিশ্বাস্য ক্রুয়েল ছিল কি সেই গডসে কুলাঙ্গারা!
এসব ভাবাভাবির অনেক বছর পর এক গান্ধীপ্রেমীর সন্ধান পেলাম ইটালীর তুরিনে, বছরখানেক আগে। দক্ষিণ আফ্রিকার এক সরকারি কর্মকর্তা, চাকরি তার লেবার ডিপার্টমেন্টে। ভারতীয় চেহারার মানুষ। মনে হচ্ছেলনা হয় তামিল হবে, নয় কানাড়; আবার হয়ে যেতে পারে শ্রীলংকার মানুষও। পরে কথায় কথায় বের হলো পিতামহের আমলে ওরা দক্ষিণ আফ্রিকার জীবন শুরু করেছিল। অনেকটা অ্যালেক্স হ্যালির ‘রুটস’-এর কুন্তাকিন্তের মতো ক্রীতদাসের জীবন। ওর পূর্বপুরুষদের শ্রম দিতে হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায় সুগার কেইন ফিল্ডের শ্রমিক হিসেবে। এসব বলার সময় কৃষ্ণসুন্দর ও সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটা মানুষটিকে গৌরবের বোধে আমি কাঁপতে লক্ষ্য করেছি। তার সর্বাঙ্গ যেন হাসছিল। তার দেহের সকল প্রত্যঙ্গ যে গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের কথা বলছিল। আমার কথা শুনে তিনি বলেছিলেন:মনে হচ্ছে গান্ধীজীর ব্যাপারে আপনারও খুব আগ্রহ আছে?
: বলতে পারেন।
: কিছু মনে করবেন না, ওর সম্পর্কে আপনি কী কী জানেন? তেমন কিছু না। জানি, আপনার দেশে ‘পিটার মারিজবার্গ’ বলে একটি জায়গা আছে। সেখানে গান্ধীকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখন সে জায়গার রেলওয়ে স্টেশনে গান্ধীজীর একটা আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে। এই পিটার মারিজবার্গ আমাদের কাছে আরো একটা কারণে পরিচিত। এখানে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে আমরা শ্রীলংকার কাছে গোহারা হেরেছিলাম। চামিন্ডা ভাস তার প্রথম ওভারে আমাদের চারজনকে কাত করেছিল। হ্যাটট্রিকসহ। সেটি ছিল ম্যাচেরও প্রথম ওভার। তারপর মিস্টার রঙ্গনাথন বললেন, আমি আরো কিছু বলি। যখন গান্ধীকে শ্বেতাঙ্গ ‘টিকিট কালেক্টার’ ট্রেনের ফার্স্টক্লাস কম্পার্টমেন্ট থেকে নামিয়ে দিয়েছিল তখন মধ্যরাত, শীতের রাত। এই রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর, অপরিচিত জায়গায়, কনকনে শীতের মধ্যে গান্ধীজীকে মশার কামড় খেতে খেতে বহু প্রত্যাশার ভোরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তরুণ ব্যারিস্টার গান্ধীকে বিলেত থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে আমার পূর্বপুরুষদের মতো দাস শ্রমিকেরা দক্ষিণ আফ্রিকায় আনিয়েছিলেন একটা মামলা লড়ার জন্য। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন ভারতীয়রা জমির মালিক হতে পারতো না।
‘কেন হতে পারবে না’— এই ছিল মামলা লড়ার জন্য বড় আনন্দে আর দায়িত্ববোধে সম্মত হয়ে এগিয়ে আসা গান্ধীর মামলার বিষয়। ট্রেনে ট্রান্সভাল যাওয়ার পথে তিনি কাউন্টারে ফার্স্বক্লাসের টিকিট চেয়েছিলেন। পেয়েও গিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না যে, ফার্স্টক্লাসে ভ্রমণ কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গদের জন্য নিষিদ্ধ। টিকিট চেকারকে তিনি ক্রোধেরবশে তর্কে টানলেন।
:আপনাকে বলতে হবে কেন আমি পকেটের পয়সায় কেনা বৈধ টিকিটে এখানে চড়তে পারবো না। কেন আপনাকে একজন বৈধ প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দিতে হচ্ছে!
: ফার্স্টক্লাসে তুমি ভ্রমণ করতে পারবে না। কারণ তোমার গায়ের চামড়া সাদা নয়। গান্ধী তখন বললেন-দেখো, তোমার গায়ের রং, অর্থাত্ তোমার ও তোমাদের অহঙ্কারের সাদা রং আছে আমার পায়ের তলায়; কিন্তু তোমার দেহের কোথাও তুমি আমার গায়ের রং দেখতে পারবে না।
এবার বল তুমি বড় না আমি?
তারপর সাদা চামড়ার টিকিট চেকার গান্ধীকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। সেখানে সারারাত শীতের ভেতর গান্ধী কাঁপতে কাঁপতে শপথ নিয়েছিলেন- মানুষের প্রতি মানুষের ঘোর এ অন্যায় সইবার নয়। আমি ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন শুরু করবো। দেশে ফিরে তিনি শুরু করলেন, ১৯১১ সালে, ঐতিহাসিক আন্দোলন-সত্যাগ্রহ।
লেখক :শ্রমজীবী কথাসাহিত্যিক
