দেশ, জাতি, অঞ্চল ও বিশ্ব ব্যবস্থা কতোগুলো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সূত্রে পরিচালিত হয়। যারা এসব নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সচেতন থাকে তারা ততো কম নির্ভুলভাবে চলতে পারে, দ্রুত এগিয়ে চলতে পারে। বিশ্বসভ্যতা এখন এমন কতোগুলো রাজনৈতিক চিন্তাধারায় বিকশিত বা পরিচালিত হচ্ছে—যা রাজনৈতিক দল, শক্তি ও গোষ্ঠীগুলোকে সম্যকভাবে অবহিত হতে হয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা তত্ত্বগতভাবে এসব ধারণার চর্চা ও গবেষণা করে শিক্ষিত সমাজকে—রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নেতৃত্বদানে যোগ্য বা সক্ষম করে তোলে, আবার রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সেইসব জ্ঞানগত ধারণায় সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করে। এভাবেই আধুনিক বিশ্ব অধিকতর জ্ঞানমুখী হচ্ছে, রাজনীতি পরিশীলিত হচ্ছে, সমাজ জীবন অপেক্ষাকৃত উন্নত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এ বিষয়গুলোকে যারা গুরুত্ব দিচ্ছে না, বুঝতে পারছে না তারা নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটে জড়িয়ে পড়ে, এতে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গভীর সংকটে আটকে থাকে। বিষয়গুলো অনেকে বোঝেন, অনেকে বোঝেন না। তার চাইতেও প্রয়োগে তত্পর হওয়ার ক্ষেত্রে কারো কারো তেমন বোধ কাজ করে না। এ ধরনের বিষয়গুলো আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলোতে বেশি প্রকট। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মতাদর্শগত বিষয়গুলো পরিষ্কার না করে ডানে, বামে, উপরে, নিচে—যে পথেই চলার চেষ্টা করা হোক না কেন সফল হওয়ার কোনো কারণ নেই। পথকে আগে জানতে হয়, চিনতে হয়, গড়তেও হয়। তা না জেনে, না বুঝে, না গড়ে চলা যায় না, রাষ্ট্র-রাজনীতিকে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। আমাদের মতো দেশে রাষ্ট্র-রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিষয়গুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভের চাইতে রাজনীতিকে সংখ্যাগত দিক থেকে বড়, কর্মী, সমর্থক, অর্থবিত্ত দিয়ে বিশালতা প্রদানের চেষ্টা হয়, সে দিকেই মনোনিবেশটা বেশি থাকে। তাতে দল বড় হয়, ভোটে জয়লাভ করা যায়, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা যায়, কিন্তু দেশকে দ্রুত আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করা খুব একটা হয় না। এগুলো অনুন্নত দেশ ও অঞ্চলের সাধারণ সমস্যা। এই সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত হয়ে চলতে পারলে এগিয়ে যাওয়া উন্নয়নের পথে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব—তেমন নজির পৃথিবীতে কম নয়। আমাদের নিকটতম বেশ কিছু দেশ ও অঞ্চল এভাবে এগিয়ে গেছে।
যখন থেকেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে, তখন থেকেই একে নীতি আদর্শ দিয়ে পরিচালিত করার প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব নীতি আদর্শ কখনো, কোথাও একরকম ছিলো না, এখনো নেই। প্রাচীন যুগের নগর রাষ্ট্র যে ধরনের শাসনে পরিচালিত হতো সে ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ তাতে প্রতিফলিত হতো, মধ্য যুগের রাষ্ট্র রাজনীতিও রাষ্ট্রচরিত্রকেন্দ্রিকভাবে নির্মিত ও পরিচালিত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের তাগিদ অনুভবের যুগ থেকে মতাদর্শগত দিকগুলো প্রসারিত হতে শুরু করে। শিল্প-বিজ্ঞান, উত্পাদনশীলতা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বে পরিচালিত সমাজ, রাষ্ট্রযুগের সূচনা থেকে আধুনিক যুগের যাত্রা সূচিত হয়। তবে যেহেতু বহুমত ও বহু পথের উদ্ভব এই সময়ে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাই রাষ্ট্র রাজনীতিও নানা আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করে। এ নিয়ে রাষ্ট্র-রাজনৈতিক বিপ্লব, আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ও সংস্কারের একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন বিশ্ব ইতিহাসে ঘটে গেছে। বিশেষত ইউরোপীয় দেশসমূহে আঠার-উনিশ শতকে মতাদর্শগত লড়াইটি প্রকট হয়। এতে পুরাতন রক্ষণশীল মতাদর্শকে অতিক্রম করার জন্যে চরম বামপন্থার দ্বন্দ্ব সংঘাতেও জড়াতে হয়। আবার পশ্চাত্পদ অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশগুলোর আধিপত্য বিস্তার, বাজার সৃষ্টিরও অভিজ্ঞতা ঘটে। এ থেকে অর্থনৈতিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টগত দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়, এক সময় সামরিক জোট সৃষ্টি থেকে নানা যুদ্ধ, মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পৃথিবী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) পৃথিবীকে ভয়াবহ অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আদর্শের লড়াই আন্তর্জাতিকতা লাভ করে। বিশ্ব সভ্যতা দুই বিশেষ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে দুই পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এসব দ্বন্দ্ব গত শতকের নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত দুই মেরুর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মতাদর্শের লড়াই ও রাজনীতি হিসেবে শক্ত অবস্থান নিয়ে ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশসমূহের পতনের পর বিশ্বব্যবস্থা একমুখী মতাদর্শের অবস্থানে দাঁড়াতে গিয়ে নতুনভাবে সংকট তৈরি হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, ইসলামী বিপ্লবের বাতাস বইতে শুরু করে, আঞ্চলিক পর্যায়েই শুধু নয়, বিশ্ব পরিসরে ধর্মীয় উগ্র মৌলবাদ, ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব হঠাত্ বেড়ে যায়। একটি আদর্শগত দ্বন্দ্ব থেকে শূন্যতার বাস্তবতা এবং নতুন নতুন প্রবণতার উন্মেষ ঘটতে থাকে। তবে পৃথিবী এবং আঞ্চলিক ও দেশভিত্তিক রাজনৈতিক মতাদর্শগত অবস্থানগুলো যদিও সর্বত্র এক রকম থাকে না, তবে দুই পরাশক্তির যুগের চরিত্র এরিমধ্যে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যে এবং সম্ভাবনায় বিশ্ব রাজনীতি ভাঙ্গা-গড়ার গতি-প্রকৃতিতে চলছে। ২০০৫-৭ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে মৌলিক যে পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা গেছে তাতে দেখা যায় রক্ষণশীল, ডানপন্থার উত্থানে মন্থরতা, উদার গণতন্ত্রের উত্থানের সক্ষমতা দৃশ্যমান হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত উদারবাদী রাজনীতির ধারায় ২০০৫ পরবর্তী সময়ে বিকাশের প্রভাব পড়েছে। ইউরোপ, আমেরিকাতেও গণতন্ত্রীদের অবস্থান সংহত হয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৬ সালের আগ পর্যন্ত জঙ্গিবাদ, উগ্র মৌলবাদ, তথাকথিত জাতীয়তাবাদ একাত্ম হয়ে যেন অপ্রতিরোধ্য শক্তি হয়ে উঠে। তবে বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির বাতাবরণ গত প্রায় ৫-৬ বছর ধরে উদারবাদী ধারার তীরে সাঁতার শেষে ওঠার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা এখনো ভাঙ্গা-গড়ার দ্বন্দ্বে ঘূর্ণায়মান। সেখানে স্বৈরতন্ত্র ভেঙ্গে এ মুহূর্তেই গণতন্ত্রের সোজাসাপ্টা স্তরে প্রবেশ বা স্থির হওয়ার অবস্থা নেই, আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে, তারপরই মেরুকরণটি স্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারবে।
বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সমাজতান্ত্রিক-গণতান্ত্রিক মিশ্র ধারার চেষ্টা করা হয়েছিল তা বিশ্ব রাজনীতির তত্কালীন বাস্তবতা থেকে অনেকটা ধার নেয়া, তবে সমাজ ও রাজনীতির তলানিকে ভালো করে দেখে বা বুঝে নেয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। তখন যুগটাই অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বাম ধারার প্রতি হেলে পড়ার, স্বীয় মর্যাদার বলে দাবিকৃত। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যাসহ বাম আদর্শমুখী সকল শক্তিকে পিঞ্জিরায় বন্দী করে রাখা হয়, দেশে উগ্র বাম, উগ্র ডানসহ সকল গুচ্ছ- পুচ্ছদের নিয়ে দক্ষিণপন্থার বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসনের যুগ পার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বামদের মিলিত শক্তির সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতসহ ধর্মের নামধারী নানা শক্তির সমন্বয়ে ডানপন্থার ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়। আওয়ামী লীগকে বাম প্রভাবিত অবস্থান থেকে আশি এবং নব্বইয়ের দশকে মধ্য উদার অবস্থানে ঠেলে আনা হয়। বিএনপিকে নতুন করে ১৯৯১ সালে পুনরুজ্জীবিত করা হয় মধ্যডানের অবস্থানে ধরে রাখার। কিন্তু বিএনপি দশকের শেষদিকে ৪ দলীয় জোট গঠন করে ডানের প্রান্তিক অবস্থানে চলে যায়। ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রান্তিক ডানের শাসন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য নিরাপদ কোনো বলয় সৃষ্টি করেনি। উগ্র ডান ঝোঁকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র অস্তিত্বের সংকটে পড়ে। তা থেকেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে মধ্য উদারপন্থার অবস্থানে আশ্রয় গ্রহণ। আমাদের দেশ, উপমহাদেশ এবং বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিককালের গতি-প্রকৃতি ও নিকট অতীতের নানা উত্থান-পতনকে বিবেচনায় নিয়েই এসব প্রপঞ্চ ও প্রবণতা সহজে নির্ধারণ করা যাচ্ছে। বিশেষত পাকিস্তান অতি ডানপন্থায় দীর্ঘদিন শাসিত হওয়ার পরিণতি সকলকে যে শিক্ষাটি বড় করে দিয়ে যাচ্ছে তা হচ্ছে উগ্র জঙ্গিবাদীদের খপ্পরে পড়লে আখেরে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব না-ও হতে পারে। এখন পাকিস্তানকে পিপিপির মতো দল দিয়েও বাগে আনা যাচ্ছে না। অন্যদিকে বাম ধারার রাজনীতি দিয়েও আজকের দিনে স্থিতিশীল কোনো অবস্থান তৈরি করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক সময় ব্যাপক সম্ভাবনাময় বাম ধারার রাজনীতি এখন ক্ষত-বিক্ষত ও বিভক্ত হয়ে আছে। তাদের মধ্যে মেরুকরণের চেষ্টা হলেও ফলপ্রসূ হচ্ছে না তাদের উদ্যোগ। বাংলাদেশের জন্য আপাতত একটি মধ্য উদার ভাবাদর্শের আবহ ধরে রাখা খুবই জরুরি। অন্তত কয়েক বছর এর স্থিতি নিশ্চিত হলে সমাজ একটি যৌক্তিক নির্মাণের দিকে অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার অভ্যন্তরে ডান ও রক্ষণশীলতার প্রসারকে মোটেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক বাংলাদেশ এ ধারাতেই চলেছিল। ফলে এই শক্তির বিনাশ খুব সহজ কাজ নয়। উদারবাদী গণতান্ত্রিক ধারার চর্চা ও বিকাশকে এগিয়ে নেয়া গেলেই পশ্চাত্পদ অপধারার কবল থেকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি বের হয়ে আসতে পারবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
