বার্ষিক পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ ও র্যাবের ৬৭ জন সদস্যকে চার ধরনের পদক দেওয়া হইয়াছে। তন্মধ্যে একজন কর্মকর্তার পদকপ্রাপ্তি লইয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। অভিযোগ আছে যে, ২০১১ সালের জুলাই মাসে বিরোধী দলের হরতাল চলাকালে পুলিশের এই কর্মকর্তা বিরোধী দলীয় চিফ হুইপকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করিয়াছিলেন। বিষয়টি তখন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাইয়াছিল। এই ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলিয়াছেন যে, সেইদিন সমাবেশের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হইয়াছিল। পুলিশের এই কর্মকর্তা নিজের জীবন বাজি রাখিয়া রাজপথের বিশৃঙ্খলা রুখিয়া দিয়াছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, উক্ত কর্মকর্তা তাঁহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। তাই সকল দিক বিবেচনা করিয়া কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্যই তাহাকে পুলিশ পদক প্রদান করা হইয়াছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই খোলামেলা বক্তব্যে বিদ্যমান বিতর্কের পালে নূতন করিয়া হাওয়া লাগিয়াছে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হইয়াছে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন দল ও মহল হইতে। বিরোধী দলীয় চিফ হুইফ দাবি করিয়াছেন যে, ইহার মাধ্যমে পুলিশ বিভাগকে কলঙ্কিত করা হইয়াছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভুলবার্তা দিতে পারে বলিয়াও আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন অনেকে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিতাহিত না ভাবিয়া হুট করিয়া কথাটি বলিয়া ফেলিয়াছেন এমন ভাবিবার কোনো কারণ নাই। অন্তত বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে কিছুটা ধারণা আছে এমন ব্যক্তিমাত্রই তাহা স্বীকার করিবেন। তিনি পোড়-খাওয়া সুশিক্ষিত মানুষ। দীর্ঘদিন জনপ্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারেরও মন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে কারাভোগ করিয়াছেন। শারীরিকভাবেও নিগৃহীত হইয়াছেন বিগত সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে। অতএব, তাঁহার বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখিবার কোনো অবকাশ নাই। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সরকারের নিকট এমন বহু তথ্য থাকে যাহা অন্যদের জানিবার কথা নহে। সেইসব তথ্যের ভিত্তিতে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি যথাযথভাবে সেইসব নির্দেশ পালন করে তাহা হইলে জনগণের চোখে বিষয়টি যতো নিন্দনীয়ই হউক না কেন সরকারের নিকট তাহা প্রশংসনীয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও সেই ধরনের একটি ইঙ্গিত আছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়। শুধু তাহাই নহে, বিগত দিনগুলিতে বিরোধী দল ও জোটের রাজপথের আন্দোলন দমনে এই ধরনের ব্যবস্থাদির সাফল্য লইয়া সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে যে একটি সন্তুষ্টির ভাবও রহিয়াছে তাঁহারা তাহা গোপন করেন নাই।
প্রতিবাদ, বিক্ষোভ কিংবা ভিন্নমত দমনে পুলিশী ব্যবস্থার কার্যকারিতা লইয়া যতো আত্মতুষ্টিই থাকুক না কেন— আখেরে ইহার ফল যে ভালো হয় না তাহার উদাহরণ ভূরি ভূরি। গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক সকল দেশের ক্ষেত্রেই এই কথা সমভাবে প্রযোজ্য। সর্বাপেক্ষা জরুরি কথাটি হইল—এই ধরনের দমন বা নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা কখনই গণতন্ত্রের পক্ষে যায় না। গণতন্ত্রে বহুমত ভিন্নমত থাকিবেই। প্রতিবাদ-বিক্ষোভ প্রভৃতিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। জোরপূর্বক তাহাকে বাধাগ্রস্ত হইলে অন্যভাবে তাহার বহিঃপ্রকাশ ঘটিতে বাধ্য। ইহা প্রকৃতিরও স্বাভাবিক ধর্ম। পর্বতগাত্র হইতে নামিয়া আসা নদীর স্রোত কোথাও কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হইলে তাহা রুদ্ধ হইয়া যায় না, শুধু গতিপথ বদলায় মাত্র। ক্ষেত্রবিশেষে তাহা আরও রুদ্ররূপ ধারণ করে। নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় রাখা উচিত। এমনকী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশেষ বা গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আইন রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ির বিষয়টিও কতোখানি গ্রহণযোগ্য তাহাও গভীরভাবে ভাবিয়া দেখা দরকার বলিয়া আমরা মনে করি। কারণ, এই ব্যাপারে এখনই সতর্ক ও সংযত না হইলে ভবিষ্যতেও ইহার পুনরাবৃত্তি ঘটিতে বাধ্য এবং তাহা যে গণতন্ত্র বা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দল ও ব্যক্তি কাহারও জন্য হিতকর হইবে না সেই কথা না বলিলেও চলে।
