জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলামের ইন্তেকাল

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩০
স্বনামখ্যাত চিকিত্সক জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম আর বাঁচিয়া নাই। গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে দশটায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন) করিয়াছেন। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়স হইয়াছিল ৮৫ বত্সর। তাঁহার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ জ্ঞাপন করিয়াছেন গভীর শোক ও সমবেদনা। অশীতিপর এই অধ্যাপকের মৃত্যুর মধ্য দিয়া পতন ঘটিল বাংলাদেশের চিকিত্সা জগতের এক মহীরুহের। তিনি একজন কৃতীবান চিকিত্সকই কেবল ছিলেন না, দেশ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন সফল সংগঠকও ছিলেন। একজন শিক্ষক হিসাবে এবং একজন চিকিত্সক হিসাবে সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধের যে পরিচয় তিনি দিয়া গিয়াছেন, তাহা বিস্মৃত হইবার মত নহে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনি ছিলেন ব্যক্তিগত চিকিত্সক। বাংলাদেশে মেডিক্যাল শিক্ষার প্রসার ও বিকাশে তিনি যে ভূমিকা রাখিয়া গিয়াছেন তাহা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৪ সালে চিকিত্সাবিজ্ঞানে উচ্চতর শিক্ষা সমাপনান্তে দেশে ফিরিয়া তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটের যুগ্মপরিচালক হিসাবে যোগ দেন। ইহার অনতিকাল পরে একই সঙ্গে তিনি এই ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক পদে বৃত হন। সুদীর্ঘ দুই দশক ধরিয়া তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকিয়া পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউটকে সংহত রূপ দান করেন, সাধারণ্যে যাহা পিজি হাসপাতাল বলিয়া পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ইহা বাংলাদেশের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। ইহাই বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ১৯৮২ সালে ঘোষিত জাতীয় ঔষধ নীতি প্রণয়নে পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা। চিকিত্সা ক্ষেত্রে শৃংখলা প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের নিকট চিকিত্সাসেবাকে সহজলভ্য করিয়া তোলাই ছিলো ঔষধনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অপ্রয়োজনীয় ঔষধের ব্যবহার রোধ করাও ছিল সেই নীতির অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্য পুরাপুরি অর্জিত না হইলেও তাহা ছিল বহুল আলোচিত। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ঔষধ নীতি ভূমিকা রাখিয়াছে। অন্যদিকে ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করিয়া তুলিতে তিনি কাজ করিয়া গিয়াছেন আজীবন। ‘আমরা ধূমপান নিবারণ করি’ সংক্ষেপে ‘আধূনিক’ নামে একটি সংগঠনও গড়িয়া তোলেন তিনি। চিকিত্সক, শিক্ষক ও সংগঠক হিসাবে তিনি যেমন রাখিয়া গিয়াছেন তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা, তেমনই কৃতিত্বপূর্ণ তাঁহার শিক্ষা জীবন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে তিনিই ছিলেন একমাত্র এমআরসিপি. টিডিডি। ১৯৬৩ সালে তিনি লাভ করেন নাফিল্ড স্কলারশীপ। তাঁহার আগে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান হইতে আর কেহই এই বৃত্তি পান নাই। ১৯৭০ সালে ভূষিত হন ‘সিতারা ই ইমতিয়াজ’ পদকে। স্বাধীনতা উত্তর কালে ১৯৮২ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমী বিজ্ঞান পুরস্কার। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপকের সম্মানে ভূষিত হন। ইহাছাড়াও ধূমপান বিরোধী আন্দোলনের স্বীকৃতি স্বরূপ পর পর তিন বত্সর তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক পুরস্কৃত হন। মনীষাদীপ্ত এই চিকিত্সকের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। মহান আল্লাহর দরবারে আমরা মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। সেই সাথে তাহার শোকসন্তপ্ত স্বজন-পরিজনের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন