১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন হতে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে অদ্যাবধি পাকিস্তানের রাজনীতি বিধ্বস্ত হচ্ছে অস্থিতিশীলতার প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে। এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইসলামাবাদে পার্লামেন্ট ভবন চত্বরে হাজার হাজার জনতার সমাবেশ আয়োজন করে পাক রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে ডক্টর মুহাম্মদ তাহির আল কাদরী বিশ্বব্যাপী খবরের শীর্ষে পরিণত হয়েছেন। এ লেখার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে: সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের এ রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তার প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা। এটা একটা মৌলিক প্রশ্ন যে, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান একই সময়ে স্বাধীনতা লাভ করার পর ভারত মোটামুটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করলেও পাকিস্তানে কেন রাজনৈতিক ঘূর্ণি লেগেই আছে। হার্ভার্ড পন্ডিত সামুয়েল পি এ হান্টিংটনের মতে— রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিশ্রুতির পরিপূর্ণ বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। যে সকল জাতি রাষ্ট্র সাংস্কৃতিক উত্কর্ষতা পুষ্পায়িত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নতি লাভ করে বিশ্বসভায় সম্মানজনক স্থান অধিকার করে। উদাহরণস্বরূপ- সাংস্কৃতিক জাগরণ ইউরোপে রেনেসাঁ, ফরাসী বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, আলোকায়ন প্রভৃতি যুগান্তকারী অধ্যায় রচনা করে গত ৫০০ বছরে ইউরোপকে পৃথিবীতে উন্নত এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৭৭৬ সালে স্বাধীন-সার্বভৌম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি হবার পর থেকে এর প্রতিষ্ঠাতা-পিতৃবর্গের সাংস্কৃতিক চেতনা ধারণ ও লালন করেই যুক্তরাষ্ট্র গত শতাব্দীতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তি (hyper power) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯১৭ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সিঁড়ি বেয়ে বলশেভিকরা জার-শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিশাল কম্যুনিষ্ট সাম্রাজ্য স্থাপন করে ইউরোপ ও এশিয়ায় তা বিস্তৃত করে। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং কম্যুনিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর বৃহত্তম জনবহুল দেশের নেতৃত্ব প্রদান করে। সত্তরের দশকে একনায়ক শাহ্ শাসনের অবসান ঘটিয়ে একদল বিদ্বান পন্ডিতের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সুদৃঢ় ভিত্তিতে আধুনিক ইরানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ব্যাপক গণজাগরণে আরব বিশ্বে যে আরব বসন্তের উদয় ঘটেছে তার পশ্চাতেও সাংস্কৃতিক পুনঃমূর্তিয়ায়নের প্রবণতা লক্ষণীয়। সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাংস্কৃতিক পরস্ফূিরণের মাধ্যমে উপরোক্ত দেশসমূহ পৃথিবীতে অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ চ্যাং দাবি করেন যে, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, চীন, জাপান ও সিংগাপুরের ব্যাঘ্র উন্নয়নের (tiger development) নেপথ্যে সাংস্কৃতিক অবদান অনস্বীকার্য। যে মৌলিক সাংস্কৃতিক চেতনায় ভারত স্বাধীনতা লাভ করে আজকের পৃথিবীতে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে ভারতের ঐ সাংস্কৃতিক আদর্শের সুদৃঢ়করণের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
পক্ষান্তরে সাংস্কৃতিক চেতনা বিস্মৃত হয়ে অপসংস্কৃতি, বিজাতীয় সংস্কৃতি ও বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের ফলে তুরস্ক, মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের একসময়কার অনেক সমৃদ্ধ দেশ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে (torn) পড়ে। পুনরায় লুপ্ত সংস্কৃতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ঐ দেশগুলো সম্প্রতি জাগরণের জয়গানে মুখরিত হতে শুরু করেছে আরব বসন্তের প্রবাহে। দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তান রাষ্ট্রটি উন্মেষের সময় থেকে দ্বিধাগ্রস্ত, স্বার্থান্ধ ও ধান্দাবাজ নেতৃবৃন্দের কারণে স্বীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিকশিত হতে ব্যর্থ হয়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ, পরিবার স্বার্থ, সম্প্রদায় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটি তাঁদের কাছে তাঁদের সাংস্কৃতিক রক্ষার উপর প্রাধান্য পায়। আস্তে-আস্তে তারা স্বকীয় সাংস্কৃতিক সুষমা বিস্মৃত হয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিহীনতায় গহীন কন্দরে পাকিস্তানকে নিক্ষেপ করে।
ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতারা অন্যায়, অনৈতিক ও অযৌক্তিকভাবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের উপর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের কালো অধ্যায় তৈরি করে। প্রতিবাদী জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করে নব্য-ঔপনিবেশিক কায়দায় পাকিস্তানের শাসকরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। কোনরূপ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ছাড়াই শাসকবর্গের স্বার্থে একের পর এক আকস্মিক ঘটনার অবতারণা করা হয়। ভাষা-আন্দোলন দমন, অপারেশনে সার্চ লাইটসহ মর্মন্তুদ নিষ্ঠুর নিধনযজ্ঞ স্বাধিকার আন্দোলনকারীদের ওপর পরিচালিত দমন-পীড়ন অভিযান প্রভৃতি অমানবিক কার্যাবলীর মাধ্যমে পাকিস্তান সৃষ্টির সাংস্কৃতিক মূলনীতিকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানের মাটিতে অভিশপ্ত রাজনীতির বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়ই পাক-রাজনীতির বাস্তব প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাই আকস্মিক, যার পেছনে সুদূরপ্রসারী, স্বচ্ছ ও প্রাগ্রসর পরিকল্পনা অনুপস্থিত। রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়ের সুযোগে বিভিন্নরূপ স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কার্যকলাপ পাকিস্তানের নিত্যদিনের চিত্র। ক্ষমতাসীন পাকিস্তান পিপল্স পার্টির অবোধ্য, অপূর্ণ, অপাংক্তেয় আধা বিদেশি মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক আদর্শ পাকিস্তানকে বিশ্ব রাজনীতিতে দিগ্ভ্রান্ত পথিকের স্থানে দাঁড় করিয়েছে। পিপিপির দুর্নীতিবাজ শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জনসমর্থন হারিয়েছেন আশাতীতভাবে। নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের দ্বিধান্বিত মূলনীতি, মুসলিম লীগের অতীত কীর্তি এবং ধুরন্ধর রাজনৈতিক স্বার্থার্জনের অগ্রাধিকার মুসলিম লীগকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে অনেক আগেই।
ক্রিকেট তারকা ইমরান খান জাতীয়তাবাদী চেতনার আহবান জানিয়ে কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তুমুল আলোড়ন তুলতে সফল হলেও পাকিস্তানকে তাঁর স্বকীয় মূল্যবোধের আলোকে পুনর্গঠিত করার নীলনকশা বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়েছেন মারাত্মকভাবে। প্রতিবেশী আফগানিস্তানের তালেবানদের বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে সোয়াত, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবাসীসহ বৃহত্ শহর এলাকায় আধুনিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নবতর চেতনা অনুভব করলেও তাদের ভ্রান্ত, যুগ-অপাংক্তেয় এবং হঠকারী কঠোর নীতির কারণে টেকসই রাজনৈতিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠায় তাঁরা চরমভাবে দিশেহারা হয়। এমনি এক অস্থির শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধূমকেতুর মতই আবির্ভূত হন অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ তাহির-উল-কাদরী। সি.এন.এন ও আই.বি.এন কর্তৃক ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ খেতাবপ্রাপ্ত দুর্লভ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এ ব্যক্তি উদারতা, আধুনিকতা, সাম্য ও শান্তির বাণী নিয়ে বিশ্বময় বিচরণ করেছেন প্রায় একযুগ ধরে। মানুষের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, সামাজিক কল্যাণ, নারী ও সংখ্যালঘুর স্বাধীনতা প্রভৃতি শ্লোগান নিয়ে তাঁর ‘পাকিস্তান আওয়ামী তেহরীক (পিএটি)’ নিম্ন ও মধ্যবিত্তসহ তৃণমূল জনসাধারণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ইতিমধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাসের দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত কাজটি শুরু করেছেন।
মরমী সাধক তাহির আল-কাদরী বর্ণাঢ্য শিক্ষা ও পেশাগত জীবনের অধিকারী। আইন, ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা নিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠন করেছেন নিপুণভাবে। অধ্যাপনা, আইন-ব্যবসা ও অন্যান্য পেশাগত কার্যকলাপে জড়িত হয়ে পাকিস্তানের সমাজ দর্শন আত্মস্থ করেছেন গভীরভাবে। ইকবাল, ইবনে আরাবী, জালালউদ্দীন রুমী, হযরত আব্দুল কাদির জিলানী (র.) প্রমুখ মনীষীর দর্শন অধ্যয়ন করে তিনি পাকিস্তানের জন্য যুগোপযোগী, ফলপ্রসূ ও কার্যকর রাজনৈতিক মডেল প্রণয়ন করেছেন যা সন্ত্রাসবিরোধী, আত্মকলহ, মারামারি, স্বার্থান্ধতা, ধর্মান্ধতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের জন্য ‘বুদ্ধিবাদিত্বের স্বর্ণযুগ’ রচনার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন:“আমি সন্ত্রাসীদেরকে মানবতাবোধের রশিতে বাঁধতে চাই, আমার জিহাদ হচ্ছে বুদ্ধিবাদিত্বের, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে”। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে মাত্র ৪ দিন ধরে ইসলামাবাদের পার্লামেন্ট চত্বরে অবস্থান করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে তিনি পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক দাবি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নে সফলতার স্বাক্ষর রাখতে যাচ্ছেন। সংসদ সদস্যদেরকে তিনি লুটেরা, চোর-ডাকাত, আইনভঙ্গকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে জনতার দাবি মানতে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দেন। ফলে সরকারের ১১ জন সদস্য আল কাদরীর সাথে সংলাপে বসেন। সিদ্ধান্ত হয় যে, আগামী ১৬ মার্চ ২০১৩ পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পিএটি ও সরকার থেকে দু’জন কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য দু’জন সত্ ও যোগ্য ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করা হবে। আজ ২৭ জানুয়ারি সরকার ও পিএটি নির্বাচন কমিশন পরিবর্তনের লক্ষ্যে যে আলোচনায় বসছেন, সে সিদ্ধান্তও সেদিন নেয়া হয়। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে গেল, যেন এক অবিশ্বাস্য সাজানো নাটক। পাকিস্তানের রাজনীতিতে আল-কাদরী ও পিএটি অনিবার্য হয়ে উঠলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, যে জনপ্রিয়তা ও জনগ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায় বিচক্ষণতা প্রদর্শনে আল কাদরী সক্ষম হলেন, তাতে যদি তিনি সরকার গঠনে সক্ষম হন তাহলে তা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কি ধরনের প্রভাব রাখবে? তাঁর রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তরিত কাঠামো কি ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রের অসাংঘর্ষিক রেখার বাইরে থাকবে? পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতাদর্শগত দ্বন্দ্বের স্বরূপ কি হবে? আরব বসন্তের সুযোগে নব-জাগরিত আরব রাষ্ট্রগুলোর সাংস্কৃতিক চেতনার স্রোতে পাকিস্তানের নব-সৃষ্ট চেতনা মিশ্রিত হয়ে পাকিস্তান তুরস্ক ইরান মিসর জুড়ে সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের যে বৃহত্তর এশীয় পরিমণ্ডল গঠিত হবে, তার সাথে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে? এ প্রশ্নগুলোর সঠিক সমাধান দরকার একটি স্থিতিশীল পাকিস্তান ও শান্তিপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিমিত্তে।
হ লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
