সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ বা এ জাতীয় বিষয়গুলো চিন্তাশীল অথবা অল্প চিন্তাশীল সব ধরনের ব্যক্তিকেই আতঙ্কিত করছে। বেশ কিছুদিন যাবত্ পত্র-পত্রিকা বা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু লোমহর্ষক, ঘৃণ্য ধর্ষণ সম্পর্কিত ঘটনার সাথে পরিচিত হয়েছি। এটা কিন্তু নতুন বা অল্প পুরাতন কোন ঘটনা নয় বরং দীর্ঘ সময় ধরে এই ঘৃণ্য সামাজিক ব্যাধিতে আমরা আক্রান্ত। কি বাংলাদেশ, কি ইন্ডিয়া, সমগ্র বিশ্বই চিন্তান্বিত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এটি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। বিগত বছরগুলোতেও ধর্ষণ সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা আমাদেরকে আতঙ্কিত করেছিল। এ সম্পর্কিত সামান্য অবগতি লাভ করার জন্য আমরা বিগত বছরগুলোর ধর্ষণ সম্পর্কিত ঘটনার কিছু পরিসংখ্যান দেখতে পারি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মানবাধিকার পর্যালোচনা ২০১২ অনুযায়ী-২০১১ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১,১৪৯ জন নারী। এর মধ্যে খুন হয়েছে ২৬৩ জন ও ১৯ জন আত্মহত্যা করেছে। এবং ২৫০ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন অনুসারে ২০১২ সালে ৫,৬১৬ জন ধর্ষণ বা এ জাতীয় সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯০০ জন নারী ও শিশু হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। ২০১৩ সালের শুরুতেই আমরা ইতোমধ্যে ১১ জানুয়ারি শুক্রবার নীলফামারিতে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণ, ১৩ জানুয়ারি রাজবাড়ীতে পাঁচ বছরের এক স্কুল পড়ুয়া ছাত্রী ধর্ষণ অতঃপর খুন, ১৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের মাধবপুরের ১৫ বছরের এক কিশোরী ধর্ষণ ও টাঙ্গাইলের গণধর্ষণ প্রভৃতি ঘটনার সাথে পরিচিতি লাভ করেছি। এছাড়াও আরোও কত হাজারও ধর্ষণ ; খুন সংঘটিত হচ্ছে যা আমাদের অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে।
আমরা ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা করে দেখতে পাচ্ছি যে, কি বৃদ্ধা, কি শিশু কেউই এই ঘৃণ্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ, একেবারে বলা চলে ‘ঘুমের ভান করে নাক ডাকছে’। বিভিন্ন মহল থেকে এর প্রতিবাদ, মিছিল, মিটিং, সেমিনার, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন প্রভৃতি করা হচ্ছে। কিন্তু তা ‘আষাঢ়ের তর্জন-গর্জন সার’ এর মতই মনে হচ্ছে।
আসলে, কোন ব্যক্তি যখন কোন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তখন তার জন্য সর্বপ্রথম ও সর্বাপেক্ষা জরুরি হলো তার রোগকে যথোপযুক্ত মাধ্যমে নির্ণয়। যদি রোগ নির্ণয় ছাড়াই তাকে ঔষধ খাওয়ানো হয় তাহলে তার সুস্থতার চেয়ে মৃত্যুর আশঙ্কাই বেশি। সুতরাং ধর্ষণের মত ঘৃণ্য সামাজিক ব্যাধিকে নির্মূল করতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই সর্বপ্রথম এর কারণগুলোকে নির্ণয় করতে হবে।
আমরা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় ধর্ষণের সংঘটনের বেশ কয়েকটি প্রধান কারণ বের করতে পারি।
কারণসমূহ নিম্নরূপ:১. যুবক-যুবতীদের নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয়। ২. অশালীন, আঁটসাঁট পোশাক পরিধান (বিশেষত মেয়েদের), উগ্র প্রসাধনীর ব্যবহার। ৩. বিজাতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর ব্যাপক প্রসার, ইন্টারনেট (বিশেষত পর্ণ সাইট, ফেইসবুক প্রভৃতি) ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা প্রদান। ৪. অভ্যন্তরীণ মিডিয়াগুলোর অশ্লীল লেখা, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। ৫. পারিবারিক সম্পর্কের ফাটল, হতাশা, নেশা জাতীয় বস্তুর সহজলভ্যতা। ৬. পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রগুলোকে ছেলে এবং মেয়েদের অবাধ চলাফেরা ও আচরণের স্বাধীনতা। ৭. হোটেল, মোটেল ও বিভিন্ন স্থানে অবাধ পতিতাবৃত্তি।
উপরোক্ত কারণগুলোই সাধারণে ধর্ষণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। সুতরাং কারণগুলো নির্ণয়ের প্রেক্ষিতে এর সমাধানও অত্যন্ত জরুরি। ধর্ষণ এর মত সামাজিক ঘৃণ্য ব্যাধি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেয়া যেতে পারে। যথা : ১. অশালীন, ছোট, আঁটসাঁট প্রভৃতি ধরনের পোশাক পরিধান, আমদানি বা তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ২. বাংলাদেশি সংস্কৃতির বাইরের, বিশেষত, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিরোধ ও দেশীয় সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা। ৩. অশ্লীল চলচ্চিত্র নির্মাণ ও আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা (বিশেষত ভারতীয় চ্যানেল ও পশ্চিমা চ্যানেলসমূহ)। ৪. দ্রুতবিচার আইনে (যথোপযুক্ত তদন্ত সাপেক্ষে) ধর্ষককে বিচার করা ও জনসম্মুখে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা (এক্ষেত্রে ফাঁসি বা এ জাতীয় যে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ)। ৫. বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছেলে ও মেয়েদের সহাবস্থান ও অশালীন আচরণ নিষিদ্ধ করা। ৬. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একেবারে নিম্নপর্যায়-উচ্চপর্যায় পর্যন্ত কার্যকরি নৈতিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। ৭. মেয়ে ও ছেলেদের জন্য আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠান ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা। ৮. পাবলিক প্যালেসগুলোতে ধর্ষণ বা এ জাতীয় আচরণের শাস্তিসমূহের শাস্তি সম্পর্কে বিলবোর্ড স্থাপন। ৯. অপ্রাপ্ত বয়স্কদের মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও ইন্টারনেটে অবাধ স্বাধীনতা প্রতিরোধ করা। ১০. সরকারকে ধর্ষণ নির্মূলে আন্তরিক সচেষ্ট হওয়া।
আমরা আশা করতে পারি যে, যদি সরকার উপরোক্ত কারণ ও সমাধান প্রক্রিয়াকে যথোপযুক্তভাবে বাস্তবায়নের পথে প্রচেষ্টা চালায়, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা ধর্ষণের মত ঘৃণ্য সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাব এবং আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
