আলোকপাত

প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৩
সিঙ্গাপুর সিভিল সার্ভিস কলেজে পনের দিনের প্রশিক্ষণে ছিলাম। ফাঁকে-ফাঁকে তাদের উন্নয়নের ভিত্তিগুলো শুনতে পেরেছি। কোন দেশের উন্নয়নের উজ্জ্বল ফলাফল দেখলে তার কলাকৌশলগুলো শুনতে কার না ইচ্ছে করে। প্রশিক্ষণের অংশ হিসাবে আমাদেরকে তাদের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নেয়া হলো। যেহেতু প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ উন্নয়নের সমন্বয় সাধন করে থাকে, তাই মন্ত্রণালয়ে পরিদর্শনের কথা শুনে জানার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। পরিদর্শনের পর চা-পানের সময় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের সাথে আমার প্রায় চল্লিশ মিনিট আলাপ হয়। মন্ত্রণালয়ের কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ অনুষ্ঠানে আমার কিছু প্রশ্ন করার কারণে উনি পরে আমার সাথে কথা বলেন। উল্লেখ্য, প্রশাসনিক মানের দিক দিয়ে সিঙ্গাপুর এশিয়ার মধ্যে প্রথম, বিশ্বে পঞ্চম। একজন উপ-পরিচালক প্রথমে মন্ত্রণালয়ের কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেন, তাতে বিশ্ব পরিবেশ, বিভিন্ন দেশের ক্লাইমেট পরিবর্তনের বর্তমান চিত্র, সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থা, ক্লাইমেট নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপ এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যা কেবল সমন্বিত চিন্তার ফলেই সম্ভব। সিঙ্গাপুরের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। ফলে একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তার ইংরেজির উপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ প্রশংসার দাবি রাখে। উল্লেখ্য, সিংগাপুর বছরে ৪০০বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমদানি এবং ৫০০বিলিয়ন ডলার মূল্যের রফতানি করে। অথচ জনসংখ্যা মাত্র চার মিলিয়ন। তাদের বেতন দু’ধরনের: নির্ধারিত এবং ক্রমবর্ধমান । নির্ধারিত বেতন ছাড়া কেউ বিশেষ দক্ষতা বা সংস্কার প্রস্তাব করলে বর্ধিতহারে বেতন পাবে। এটা উদ্যমতা,উদ্যোগী কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করার এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। একটা স্থায়ী ব্যবস্থার অধীনে যে কোন কর্মকর্তা কোন বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে পারেন। যদি এই সংস্কারের কারণে কোন প্রতিষ্ঠানের খরচ কমে বা আয় বাড়ে তাহলে আনুপাতিক হারে উক্ত সংস্কারক পুরস্কার হিসাবে অর্থ পাবেন। তাই সিঙ্গাপুরকে সংস্কারের দেশও বলা হয়। প্রশিক্ষণে বলা হয়েছে,তারা মালয়েশিয়া থেকে পানি আমদানি করে, এ ধরনের নতুন কথা শুনে আমাদের মধ্যে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের নদীর পানিতে লবণাক্ততা আছে। ফলে প্রক্রিয়া করে সুস্বাদু করতে যে খরচ হয় তার চেয়ে কম খরচে আমদানি করা যায়। এ কারণেই সিঙ্গাপুরে ব্যবহারিত পানি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবার ব্যবহার করা হয়। অর্থাত্ একজনের ব্যবহার করা গোছলের পানি অন্যে খাচ্ছে। কল্পনায় বিষয়টা বিশ্রী। কিন্তু বাস্তবে বুঝার উপায় নেই যে একজন অন্যের ব্যবহূত পানি খাচ্ছে। আমরা ইলেক্ট্রোনিক টিকিট ব্যবহার করে ট্রেনে ভ্রমণের পর আবার সে ব্যবহূত টিকেট অল্প মূল্যে বিক্রি করতে পেরেছি। কারণ ব্যবহূত টিকিট প্রক্রিয়া করে নতুন টিকিট বানাতে খরচ কম পড়ে। এ যেন কৈ মাছের তেলে কৈ ভাজা। এ জন্যই প্রশিক্ষণে বলা হয়েছিল, তাদের উন্নয়নের একটি ভিত্তি হলো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। আসিয়ান সদস্যভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে ৩০ ভাগ বাণিজ্য করে। এক দেশ অন্য দেশে শিল্প-কারখানা করছে উত্পাদন খরচ কমানোর জন্য, তাদের কাঁচামাল এবং উন্নত অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য। এদের নীতি, প্রতিষ্ঠান গুলো এমনভাবে সাজানো যে কোন সুযোগই হাতছাড়া হয় না। সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, জনসংখ্যা বর্তমান পর্যায়ে রাখা। কারণ জায়গার স্বল্পতা। তাই সিঙ্গাপুরের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কেঁদেছিলেন যখন শুনলেন, মালয়েশিয়া একতরফা ভাবে সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। এটা ১৯৬৪ সালের কথা। কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে লোকজন থাকবে কোথায়। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর এক সময় মালয়েশিয়ার একটি প্রদেশ ছিলো। আমি এক ট্যাক্সি ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সিঙ্গাপুর উন্নত না মালয়েশিয়া উন্নত। সে বললো, সিঙ্গাপুর। কারণ মালয়েশিয়া বিদেশি সাহায্য নেয়, সিঙ্গাপুর নেয় না। চমত্কার ইংরেজিতে সে জবাব দিলো। সত্যি, লোকদের দক্ষতা বাড়লে দেশ এমনিতেই উন্নতি হয়। জায়গা নেই। অথচ সিঙ্গাপুরের প্রায় দশভাগ বাগান বানিয়ে রাখা হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। বেসরকারি খাতে বাড়ি করার সুযোগ নেই। সরকারই বাড়ি করে ফ্ল্যাট বিক্রি করে। তাদের জায়গা কম। কিন্তু দুটি ভবনের মধ্যে প্রচুর খালি জায়গা রাখা আছে, রাস্তায় বিশাল ফুটপাত। একে বলে সত্যিকারের আভিজাত্য। সমস্যা থাকবে, আভিজাত্যের ব্যাপারে ছাড় নেই। সঙ্গত কারণেই তাদের ভবন উঁচু। কিন্তু অধিকাংশ বাসাবাড়িই ৮০০ বর্গফুটের। সিঙ্গাপুর এতো খোলামেলা, মনেই হয় না তারা জায়গার স্বল্পতায় ভুগছে। আমরা দেখেছি নদীশাসন করে কয়েক হাজার একর জমির চর সৃষ্টি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে নতুন শহর গড়ার কাজ শুরু হয়ে গেছে। লেখক :উপ-সচিব, অর্থ বিভাগ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন