ঝালে ঝোলে অম্বলে

পেটানোর জন্য পুরস্কার

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
এবারের জাতীয় পুলিশ সপ্তাহে বিএনপির এমপি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পিটুনি দেয়ার পুরস্কার হিসেবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা পদক পেয়েছেন। না, কোনো দুর্মুখ নিন্দুকের রটনা নয়, স্বয়ং সরকার এটা কবুল করেছেন। জয়নুল আবদিন ফারুক সাহেবকে রাজপথে আঘাত করা নিয়ে সমালোচনায় পড়া উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুনুর রশিদ এবার পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ (পিপিএম) পেয়েছেন। তার এই পদক পাওয়ার ক্ষেত্রে ফারুককে রাজপথে আঘাত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল বলে সরকারি মহল থেকে জানানো হয়েছে। আঘাত করা বা পেটানোর জন্য পুরস্কার পাওয়াটা আমাদের দেশে নিঃসন্দেহে নতুন সংযোজন। নিজেদের দায়িত্ব-কর্তব্যসীমার বাইরে গিয়ে একজন রাজনৈতিক দলের দশাসই জোয়ান নেতাকে পিটিয়ে শুইয়ে দিতে পারাটা পুলিশের জন্য অবশ্যই বীরত্ব। পদক প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। জয়নুল আবদিন ফারুক এমপিকে পেটানোর জন্য অবশ্য শুধু পুলিশকে দোষ দেয়া যায় না। কারণ এক হাতে তালি বাজে না। কেন ভাই, আপনি কেন সেদিন পুলিশের সঙ্গে অমন ‘বেয়াই’সুলভ আচরণ করতে গিয়েছিলেন? কেন সেধে পুলিশের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন? অমন মওকা পেলে তো পুলিশ পেটাবেই। আর পুলিশ পেটাবেইবা না কেন? পেটানোর শিক্ষা আমাদের পারিবারিক শিক্ষা। আদর্শ অভিভাবকরা অবাধ্য ছেলে-পুলেকে পিটিয়েই সোজা করেন। লেখাপড়া না পারলে শিক্ষকরাও অকাতরে ছাত্র পেটান। শক্ত লোহা আগুনে পোড়ানোর পর পিটিয়ে কামাররা পছন্দমত আকার দিয়ে নানারকম জিনিস তৈরি করেন। ভূতে ধরলেও আমাদের দেশে পিটিয়েই ওঝারা ভূত ছাড়ান। কাজেই পুলিশ যখন রাজপথে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পেটায় তখন সে একই সঙ্গে অভিভাবক, কামার, শিক্ষক ও ওঝার ভূমিকা পালন করে। পুলিশের মতো এমন চৌকস বাহিনী আর কে আছে? তাদেরই তো পুরস্কার দেয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে শুধু পুলিশকে পদক না দিয়ে পুলিশের সহযোগী হিসেবে ছাত্রলীগকেও বিবেচনা করা যেত। প্রতিপক্ষকে পেটানোর ব্যাপারে তাদের অবদানও পুলিশের চেয়ে কিছু কম নয়। প্রতিপক্ষ না পেলে তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাদের কত সাহস, কত না শৌর্য-বীর্য! একটা-দুটো পদক তাদের জন্যও বিবেচনা করা যেত এবং এটা পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ)-এর উদাহরণ হতে পারত। আর শুধু পেটানো নয়, পিটিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়ার জন্য সম্প্রতি গাজীপুরে যারা গণপিটুনিতে অংশ নিয়েছেন কিংবা সাভারে যারা পিটিয়ে সাত ছাত্রকে হত্যা করেছিল, তাদের কথাও বিবেচনা করা যেত। তাদের জন্য অবশ্য রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক না দিয়ে জনসংখ্যা পদক দেয়া যেতে পারে। কারণ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তারা অপরিসীম ভূমিকা পালন করেছেন। জনসংখ্যা পুরস্কারের জন্যও তাদেরকে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, পদক জেতার পর পুলিশকে নিয়ে একশ্রেণির মানুষের অপতত্পরতা ও গালাগাল করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। তারা পুলিশের ভূমিকা এবং পদক পাওয়া নিয়ে সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছেন। যেন পদক পেয়ে পুলিশ বিরাট অন্যায় করে ফেলেছে। সেদিন পুলিশ যদি ফারুক সাহেবকে না পেটাত, তাহলেও সম্ভবত তাদের সমালোচনাই করা হতো। সম্প্রতি জামায়াত-শিবিরের উগ্রকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের উপর হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আর পুলিশ সুবোধ বালকের মতো অকাতরে কিল হজম করেছে। এই কিল খেয়ে কিল হজম করার গান্ধীবাদী নীতি গ্রহণ করার পরও পুলিশকে সবাই গালাগাল করেছে। আমাদের দেশের মানুষের স্বভাবই অবশ্য গালাগাল করা। আর পুলিশের কপাল হচ্ছে এই গালাগাল হজম করা। অভাবের সংসারে হাবাগোবা বেকার ছেলেকে যেভাবে সারাক্ষণ গালাগাল হজম করতে হয়, আমাদের দেশের পুলিশকেও সব সময় গালাগাল হজম করতে হয়। আমাদের দেশে পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ, পুলিশের যে আচরণ তাতে অবশ্য সারাজীবন গাল দিলেও পাওনা পরিশোধ হবে না। সমাজের বেশিরভাগ লোক তাই চান্স পেলেই পুলিশকে একটু গাল দিয়ে মনের জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করে। এতে অবশ্য মনটা বেশ হাল্কা হয়। মনের জ্বালা মনে রাখলে উত্তেজনা বাড়ে, অস্থির লাগে, ভাঙচুর করতে ইচ্ছে হয়। তার চেয়ে মনের সুখ মিটিয়ে দেশি ও আঞ্চলিক ভাষায় পুলিশকে দু-দশটা গাল দিতে পারলে মনটা শরতের আকাশের মতো ফুরফুরে হয়। লাফাতে ইচ্ছে করে। প্রতিবেশিনীর রূপ নিয়ে ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ মার্কা কাব্য করার সাধ জাগে। আমাদের এই ছকে-বাঁধা একঘেয়ে নিরানন্দ জীবনে তেমন কোনো সুখ বা সুসংবাদের আভাস নেই, বউ-বাচ্চার সঙ্গে রাগ-অভিমান-কথা চালাচালি ছাড়া নেই তেমন কোনো বিনোদন। গালাগালিই আমাদের একমাত্র বিনোদন। বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের নেতানেত্রীরা পর্যন্ত সারাক্ষণ একে অপরের বিরুদ্ধে গালাগাল চর্চা করেন। প্রয়োজন আছে বলেই আমাদের নেতানেত্রীরা গালাগাল চর্চা করেন। সবজান্তা কলামিস্ট ও টিভি টকশোর আলোচকরাও নিয়মিত গালাগাল ‘রচনা’ ও বর্ষণ করেন। গালাগাল আছে বলেই যেন আমাদের দেশ আছে, রাজনীতি আছে, আমরা আছি। তা না হলে এদেশের মানুষগুলো বুঝি দম বন্ধ হয়েই মারা পড়ত। গালি দিয়ে আমরা সুখ পাই, আনন্দ লাভ করি, বেঁচে থাকার প্রেরণা পাই। পুলিশকে গালি দিতে পারলে তো স্বর্গসুখ লাভ করি। তবে এ গালি আড়ালে-আবডালেই দিতে হয়। এর দুটি স্পষ্ট কারণ আছে। প্রথমত, সামনাসামনি গালি দিলে সে বাপের নাম ভুলিয়ে দিতে পারে (পুলিশের উপ-কমিশনার হারুনের কিল খেয়ে জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি সাহেব যে দৌড়টা দিয়েছিলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তেমন দৌড় আর কেউ দিয়েছেন বলে মনে হয় না। ১০০ মিটার অলিম্পিকে ফারুক সাহেবকে দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে যদি পুলিশের উপ-কমিশনার হারুনকে দিয়ে একটা দাবড়ানি দেয়া যায় তাহলে আমি নিশ্চিত, উসাইন বোল্ট কাছে পরাস্ত হবে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আগামী অলিম্পিককে সামনে রেখে বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন, ফারুক সাহেবও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিতে পারেন)। দ্বিতীয়ত, কোনো পুলিশকে মুখের সামনে গালি দিলে সে মনে আঘাত পেতে পারে। যেহেতু পুলিশও মানুষ, তাই আমরা জেনেশুনে তাদের মনে আঘাত দিতে চাই না। যাহোক, পুলিশের গায়ের চামড়া এবং পোশাক যথেষ্ট মোটা। ওগুলো ভেদ করে গালাগাল তাদের স্পর্শ করতে পারে না। তাছাড়া তারা আপোষহীনও বটে। আমরা চাই বা না চাই তাদের কাজ তারা করেই যায়। যেমন—ঘুষ-দুর্নীতি, অপরাধীদের পাকড়াও করার ক্ষেত্রে উদসীনতা ও ব্যর্থতা, নিরীহদের মনের সাধ মিটিয়ে পেটানো, নারীদের ক্ষেত্রে একটু বেসামাল হওয়া ইত্যাদি। বর্তমানে আমাদের দেশে দুর্বৃত্তের আধিক্য দেখা দিয়েছে। এ দুর্বৃত্তদের সামলানোর আইনগত দায়িত্ব যাদের দেয়া হয়েছে, সেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আরো বড় দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছে। তারা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে পেশাদার অপরাধীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপকর্ম করছে, নিয়মিত ডাকাতি-ছিনতাই-রাহাজানিতে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ কেবল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেই জড়িয়ে পড়ছে না, তাদের আচার-ব্যবহারও বদলে যাচ্ছে। স্কুল ও পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা—কোনো কিছুই তাদের নম্র-ভদ্র-সত্ বানাতে পারছে না। এমনকি শাস্তির ভয়ও তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারছে না। তাদের জ্বালায় সবাই অতিষ্ঠ। ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ কিংবা ‘ভদ্রতা বজায় রাখুন’ মার্কা উপদেশ তাদের জীবনে কোনো প্রভাবই ফেলেনি। আমাদের দেশে পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে তাদের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়নি—এমন সৌভাগ্যবান বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। পুলিশের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু ভালো আচরণ পেয়েছেন ক’জন? পুলিশের কর্তাব্যক্তিরাও বারবার স্বীকার করছেন, পুলিশের আচরণ মোটেই ভালো নয়। মাঝে মাঝে কর্তাব্যক্তিদের পক্ষ থেকে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়। সময়ে সময়ে তাদের সদাচারও শেখানো হয়। কিন্তু এ সদাচার শিক্ষার কোনো সুফল পাওয়া যায় না। তারা যথারীতি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। স্বভাব বলে কথা। স্বভাব কি আর সহজে বদলায়? আসলে ভালো হওয়া খুব কঠিন কাজ। স্বভাব বা খাসলত সহজে পাল্টানো যায় না। তা সে পুলিশই হোক, আমলা-মন্ত্রী-বিরোধীদলীয় নেতাই হোক, আর অপরাধীই হোক। জ্ঞান, উপদেশ, পরামর্শ দিয়ে, ধর্মের কাহিনী শুনিয়ে, এমনকি শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাউকে ভালো বানানো সম্ভব বলে মনে হয় না। ভালো হওয়াটা বিশেষ গুণ। এজন্য পরিবেশ লাগে, ইচ্ছে ও অনুশীলন প্রয়োজন হয়। ভালো হওয়ার জন্য সদিচ্ছার পাশাপাশি ভালো অভিভাবক লাগে। তা না হলে কাউকে ভালো বানানো যায় না। অভিভাবক নিজে যদি অসত্ বা খারাপ হন, তাহলে তার ভালো হওয়ার নির্দেশ কে শুনবে? লেখক: কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন