বারাক ওবামা। শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রো-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তবে সাংবিধানিক এবং প্রত্যক্ষভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেও তাকে সারা বিশ্বের দিকেই নজর রাখতে হয়। প্রথম মেয়াদ শেষ করে গত ২০ জানুয়ারি পা রাখলেন দ্বিতীয় মেয়াদে। প্রথম মেয়াদে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক সফলতার পাশাপাশি ছিল কিছু ব্যর্থতাও। শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের চ্যালেঞ্জগুলোও হয় শক্তিশালী। সংবিধান তাকে চার বছর সময় দিলেও বাস্তবে অনেক সমস্যার সমাধান করতে অনেক আগেই ওবামাকে তার দ্বিতীয় মেয়াদে ঘরে-বাইরে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। গত ২১ জানুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে ওবামা বলেছেন, বাইরের সমস্যার চেয়ে দেশের ভেতরের সমস্যাকে মোকাবিলা করাই হবে আমাদের মূল কাজ। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগাবেন ওবামা। আগামী ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাকে অনেক সমস্যার সমাধান করতে হবে। এজন্য তিনি ওভাল অফিসের ক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিছু সমস্যা সমাধান নির্বাহী আদেশে করার চেষ্টা করবেন। দেশের ভেতরে যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে :
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ: যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের লাইসেন্সে শিথিলতা থাকায় অনেকেই অস্ত্র কিনতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তি মালিকানায় ২০ থেকে ৩০ কোটি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। তবে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর দেশটির একটি স্কুলে বন্দুকধারীর গুলিতে ২০ জন শিশুসহ ২৮ জন নিহত হয়। এরপর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ওবামার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি নিয়ন্ত্রণে বলা যতোটা সহজ করা ততোটাই কঠিন। কারণ অস্ত্র ব্যবসায়ীরা দেশটিতে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী। ইতোমধ্যে ওবামা তার নির্বাহী আদেশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি বিলের অনুমোদন দিয়েছেন। তবে অস্ত্র বিক্রেতাদের সংগঠন ন্যাশনাল রাইফেলস এসোসিয়েশন বিলের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে। তারা বলেছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করুন।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: ওবামার সামনে রয়েছে বিরাট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে রয়েছে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা, বেকারত্বের হার কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। প্রাক স্কুল শিক্ষা, চাকরির প্রশিক্ষণ, মধ্যবিত্তদের জন্য অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, উত্পাদন খাত পুনরুদ্ধার করা, শক্তি সম্পদ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ব্যবসার সমপ্রসারণ, মধ্যবিত্তদের চাকরির সঙ্গে শিক্ষার উন্নয়ন। বাজেট ঘাটতি কমাতে কর পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। দেশটিতে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৮ সালে দেশটির অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি হয় যার প্রভাব পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক গবেষণাসহ অনেক কিছুই দেশটিকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম করে তুলবে। হোয়াইট হাউজের হিসাব মতে, বিভিন্ন খাতে ২০১৭ সালের মধ্যে ওবামা প্রশাসনকে ১৬ শতাংশ ব্যয় হ্রাস করতে হবে। সামরিক ও বেসামরিক খাতে সমানভাবে এ অর্থ হ্রাস বিভাজিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলার। রয়েছে ঋণ সংকট। এসব কাটিয়ে উঠতে ধাক্কা খেতে হতে পারে ওবামা প্রশাসনকে। যদিও এ বছর কর সংক্রান্ত একটি বিল কংগ্রেসে পাস হয়েছে।
অভিবাসন নীতি সংস্কার: যুক্তরাষ্ট্রে গত দুটি নির্বাচনে বিদেশিদের অধিকাংশ ভোট পেয়েছেন ওবামা। বিশেষ করে হিস্পানিকরা তার একনিষ্ঠ সমর্থক। দেশটিতে প্রায় এক কোটি দশ লাখ লোক অবৈধভাবে বসবাস করছেন। ওবামা তাদের নাগরিকত্ব দিতে অভিবাসন নীতি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এক আইনের মাধ্যমে ৩০ লাখ অবৈধ নাগরিককে বৈধতা দিয়েছিলেন। এই মাসে ওবামা প্রশাসন একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছেন। আইন অনুযায়ী যে সব পরিবারের স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তানরা অবৈধভাবে বাস করছেন তারা বৈধ হওয়ার আবেদন করতে পারবেন। আইনে তাদের নাগরিকত্ব বা গ্রিন কার্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আগামী ৩ মার্চ থেকে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্র গ্রহণ করবে। আইনের চূড়ান্ত অনুমোদনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং সমস্যা: প্রায় একশ’ বছর আটকে থাকা স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ওবামার জন্য বড় ধরনের অর্জন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে গঠিত। দেশটিতে ‘মেডিকেয়ার ও মেডিকেড’ নামে দুই ধরনের স্বাস্থ্য বীমা রয়েছে। মূলত ৬৫ বছরের ওপরের বয়সীদের জন্য মার্কিন সরকারের সামাজিক বীমা হলো মেডিকেয়ার। আর কেন্দ্রীয় সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর যৌথ কর্মসূচি হলো মেডিকেড। মেডিকেড চালু করা হয়েছিল প্রধানত নিম্নআয়ের মানুষ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা বা অলস মানুষদের জন্য। ওবামার স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার বিল অনুযায়ী অধিকাংশ নাগরিকই স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসবে। স্বাস্থ্য বিল কাজ শুরু করবে ২০১৪ সাল থেকে। সমস্যা হবে বাজেট নিয়ে। এই ভর্তুকি দিতে ওবামাকে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে হবে। রিপাবলিকানরা এই জন্য বিরোধিতা করে আসছে যে বাজেট ঘাটতির এই সময়ে এই বিল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ বছর তার ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। পরিবেশবিদরাও তাকে চাপ দিচ্ছেন তাকে কিছু করার জন্য। পরিবেশবিদরা আশা করছেন, ওবামা কয়লা থেকে উত্পাদিত বিদ্যুত্ উত্পাদনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর দিকে নজর দিবেন। পরিবেশ রক্ষা সংস্থা সিয়েরা ক্লাব বলেছে, আমরা আশা করি, ওবামা আমাদের এবং ভবিষ্যত্ আমেরিকার জন্য বিশুদ্ধ বাতাস এবং বিশুদ্ধ পানি রেখে যাবেন।
বাইরের চ্যালেঞ্জ:বর্তমানে ওবামা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। জাতিসংঘে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গিকার করেছে। শনিবার ইরান সিরিয়ার ওপর হামলা প্রতিরোধ করার হুমকি দিয়েছে। ইসরাইল চাইবে ইরানের ওপর হামলা করার। ইসরাইলকে এই কাজ থেকে বিরত রাখাটাও ওবামার জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। ফিলিস্তিন এবং ইসরাইল সংকট দীর্ঘদিনের। এই সংকট তিনি কিভাবে মোকাবিলা করেন সেটাই দেখার বিষয়। আফগানিস্তান থেকে আগামী ২০১৪ সালের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। ২০১১ সালে পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনের হত্যা পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে ড্রোন হামলার ঘটনায় দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। আফগান সীমান্তে তালেবানের হামলা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ওবামাকে।
