বিশ্বমন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও কন্যা শিশু

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৫
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নারী ও কন্যা শিশুরা। দেশে দেশে সংকুচিত অর্থনীতি কন্যা শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি নারী অবমাননার শিকার হচ্ছে কিংবা ক্ষুধার্ত থাকছে। আর এটি সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে পৌঁছতে সামপ্রতিক বছরের অর্জনগুলো ধীরে ধীরে ধ্বংস করে ফেলছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল (সারা বিশ্বে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান) এবং ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের (সারা বিশ্বে উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করে এমন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী নিজেল চ্যাপমান বলেন, গত ৫ বছরে যে উন্নতি হয়েছে তা খুবই হতাশাজনক। এটি একটি মর্মপীড়াদায়ক ঘটনা, কারণ আমি মনে করি না অন্য কেউ সত্যিই বিষয়টি খেয়াল করেছে। চ্যাপমান এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, মেয়েরা যখন খুব ছোট থাকে, ঠিক তখনই সমস্যাটি শুরু হচ্ছে। মেয়েরা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহত্তম প্রান্তিক গোষ্ঠী। অর্থনীতির আকার সংকুচিত করায় কন্যা শিশু মৃত্যুর আনুপাতিক হার ছেলে শিশুর মৃত্যুহারের চেয়ে ৫ গুণ বেড়েছে। তিনি ৫৯টি দেশের এ ধরনের সমস্যা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের করা গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যদি অর্থনৈতিক উত্পাদন এক শতাংশ কমানো হয় তাহলে এক হাজার শিশুর মধ্যে কন্যা শিশুর মৃত্যুহার বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক চার শতাংশে। যেখানে ছেলে শিশুর মৃত্যুহার ১ দশমিক ৫ ভাগ। এটা অত্যন্ত প্রকট দারিদ্র্যের প্রভাবের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উদাহরণ। প্ল্যানের রিপোর্টে বলা হয়, বিভিন্ন সূত্র যেমন অ্যাকাডেমিক স্টাডিজ বা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থনৈতিক কারণে লিঙ্গভেদে আসলে কী ধরনের প্রভাব পড়ে এটি নিরূপণে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তবে যে তথ্যই পাওয়া গেছে, তাতে এটা স্পষ্ট অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনীতি সংকোচনের কারণে মেয়ে এবং অল্পবয়স্ক নারীই সুনির্দিষ্টভাবে সবচয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। মন্দা চারদিকে দারিদ্র্য ছড়িয়ে দেয়। আর দারিদ্র্য মেয়েদের স্কুল থেকে ঝড়ে পড়ায়। মন্দার প্রভাবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই ২৯ শতাংশ মেয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। যেখানে ছেলেদের ক্ষেত্রে এ হার ২২ শতাংশ। মেয়েরা এ সময় স্কুল ছেড়ে বাড়িতে মায়ের সঙ্গে গৃহস্থালি কাজে সাহায্য করে। কারণ মাকে তখন অল্প মজুরিতে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। চ্যাপমান বলেন, মেয়েরা ঘরের কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। আর একবার যদি সে স্কুল ছেড়ে দেয়, পুনরায় স্কুলে যোগ দিয়ে আগের মতো পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে অপেক্ষাকৃত বেশি কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে এ সময় বাল্যবিয়ের হার বেড়ে যায়। অনেক পরিবারই তখন কন্যা সন্তানের ভরণ পোষণের ব্যয় নির্বাহ করতে পারে না। অভাব-অনটনের হাত থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ পন্থা হিসেবে অল্প বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে তুলে দেয় অন্যের হাতে। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের কাজে পাঠায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌন কর্মী হিসেবেও মেয়েদের কাজ করতে হয়। মন্দার সময় ঘরের ভেতরেও অনেক নারী ও কন্যা শিশু আগের চেয়ে অনেক কম খাবার পায়। ঘরের প্রধান জীবিকা অর্জনকারীর মুখে খাবার তুলে দিতে অনেক নারীর নিজের খাবার তুলে দেয়ার প্রবণতাও এ সময় দেখা যায়। নারী ও পুরুষদের মধ্যে এ সময় খাদ্য ও পর্যাপ্ত পুষ্টির অসমতা আরো তীব্র হয়। আর সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করে মায়েরা, নিজের খাবার তুলে দেন সন্তানের মুখে। চ্যাপমান বলেন, মায়েরা ধীরে ধীরে হয়ে পড়েন দুর্বল থেকে দুর্বলতর এবং অসুস্থ। তারা নিম্নাভীমুখী একটি চক্রের মধ্যে পড়ে যান। অর্থনৈতিক মন্দার আগে যে অবস্থা ছিল তারচেয়ে বেশি অবজ্ঞা আর অবমাননা ভোগ করেন নারী ও মেয়েরা মন্দা চলাকালীন সময়ে। আর নারী যখন গর্ভবতী হন, তারা আগের চেয়ে কম সাহায্য পান। গর্ভকালীন সময়ে নারীদের বিশেষ করে ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মৃত্যু হার তখন বেড়ে যায়। নারী ও মেয়েরা মন্দার সময়ে প্রধান সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তায় আগের চেয়ে কমে যায় প্রবেশাধিকার। ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক নিকোলা জোনস বলেন, মেয়েদের মৌলিক মানবাধিকারের ওপর হুমকি আরো বাড়ছে। বেশিরভাগ সমস্যাই হচ্ছে লিঙ্গ বৈষম্যের কারণে। তিনি এ সমস্যা সমাধানে কিছু উপায় বাতলেছেন। যেমন:সমস্যা সমাধানে অবশ্যই আন্তর্জাতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নারীদের পর্যাপ্ত খাবার যোগানো, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, তারা যাতে স্কুলে যেতে পারে এটা নিশ্চিত করা এবং পড়াশোনা শেষে তাদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সর্বশেষ চ্যাপম্যান বলেন, একদিকে নারী ও মেয়ে এবং অন্যদিকে ছেলে এবং পুরুষদের মধ্যে যে ব্যবধান আছে তা দূর করতে হবে।