আনলাকি থার্টিন ভেনিজুয়েলার!

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
আনলাকি থার্টিনের দুর্ভাবনায় ভেনিজুয়েলাবাসী। দুঃসংবাদ দিয়েই বছর শুরু হয় তাদের। মৃত্যু পথযাত্রী প্রিয় নেতা প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ। এর আগে তার এত অসুস্থতার খবর কাক পক্ষীকেও জানতে দেয়া হয়নি। তবে ১৮ মাসে চারবার অস্ত্রোপচারের পর শ্যাভেজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জাতিকে জানানো প্রয়োজন মনে করলো কারাকাস। তিন জানুয়ারি তথ্যমন্ত্রী আর্নেস্তো ভিলেগাস জানান, ৫৮ বছর বয়সী নেতার ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ। শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। কিউবার রাজধানী হাভানার কিমেক হাসপাতালে শ্যাভেজকে আরো বেশ কিছুদিন চিকিত্সকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। ব্যস এটুকুই। অবশ্য সেটুকুও হয়তো জানা যেত না, যদি না ১০ জানুয়ারি চতুর্থ মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবার কথা থাকতো হুগো শ্যাভেজের। সমাজতান্ত্রিক নেতার নাজুক অবস্থার বিস্তারিত খবর জানতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর শ্যাভেজের শ্বাসনালীতে ছয় ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ব্যাপক রক্তক্ষরণ হয়। সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণে জটিলতা বাড়ে শ্যাভেজের দেহে। এর বাইরে আর কিছুই জানা যায়নি। সরকারের অতি গোপনীয়তার সুযোগে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, হুগো শ্যাভেজ হয়তো আর নেই। অথবা তিনি মৃত্যুর খুব কাছে- কোমায়। এ ইস্যুতে রাজনীতির মাঠও গরম করে তোলে বিরোধী দলগুলো। দাবি তুলে বসে, নির্ধারিত দিনে প্রেসিডেন্টের শপথ না হলে সংবিধান অনুসারে ত্রিশ দিনের মধ্যে পুনঃনির্বাচন দিতে হবে। এ অবস্থায় হাভানা সফর শেষে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো জানান, আগের সমান লড়াকু মনোভাব নিয়েই হুগো শ্যাভেজ এখন সচেতন। বচনে, আত্মবিশ্বাসে আগের মতোই তিনি তেজদীপ্ত, শৌর্যবান। এতেও বন্ধ হয়নি পুনঃনির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলের প্রচারণা, সমাবেশ। তাদের সাধারণ প্রশ্ন হলো হুগো শ্যাভেজ কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন? ফিরলেও দেশ শাসন করার মতো শারীরিক অবস্থা তার থাকবে কি-না? কী ধরনের ক্যান্সারে শ্যাভেজ আক্রান্ত? তাতে বাঁচার আশা থাকে কি-না? এখন পর্যন্ত এ সব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেনি সরকার। গত অক্টোবরের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজিত বিরোধীরা ভেবেছিলো, শ্যাভেজের অনুপস্থিতির সুযোগে জোর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে সমাজতান্ত্রিক সরকারের ভিত নড়ে যাবে। কিন্তু তা না হয়ে বরং শ্যাভেজের প্রতি আনুগত্য অটল রাখার ঘোষণা দেয় সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানই। এমনকি শ্যাভেজ পরে যে কোন সময় শপথ নিতে পারবেন বলেও রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। আসলেই তাই। হুগো শ্যাভেজের বৈপ্লবিক মতাদর্শ বা তার ভিত্তিতে তৈরি সমাজ বা রাষ্ট্রকাঠামো এক নিমেষেই চুড়মার হবার নয়। বলিভারিয়ান মুভমেন্টের বর্ধিত কলেবরকে তার মৃত্যুর পর হয়তো বলা হবে শ্যাভিজম। শ্যাভিজমকে ঘিরেই হয়তো আবর্তিত হবে ভেনিজুয়েলার রাজনীতি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, হুগো শ্যাভেজের পর কে হবেন তার স্থলাভিষিক্ত? কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রোর মতো আদান শ্যাভেজ কি তার ভাইয়ের স্থান নিতে পারবেন? নাকি পার্লামেন্ট সভাপতি দিওসদাদো কাবেলো বা ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দেখা যাবে সমাজতন্ত্রের চালক হিসেবে? সত্যটা হলো, হুগো শ্যাভেজ যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, ক্ষমতার রদবদল নিয়ে ভাবছে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি। হুগো শ্যাভেজের মৃত্যু বা তার গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে নানামুখি রটনাকে ভেনিজুয়েলায় অনিশ্চয়তা আর নৈরাজ্য সৃষ্টির মনস্তাত্ত্বিক লড়াই মনে করা হলেও দু’টি ক্ষেত্রেই পুনঃনির্বাচন অনিবার্য। অনেকেই বলছেন, শ্যাভেজ সর্বশেষ কিউবা রওনা হবার আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাদুরোকেই পরবর্তী নেতা মনোনীত করে গেছেন। তবে এতে ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরির আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। বেসামরিক সংগঠন শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা মাদুরোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন পার্লামেন্ট সভাপতি কাবেলো। যার ব্যাকগ্রাউন্ড সেনাবাহিনী। বিশ্লেষকরা বলছেন, সেনা সদস্য হয়েও আপামর মানুষের মুক্তি অর্জনে হুগো শ্যাভেজ ছিলেন ক্যারিশমেটিক। একাধারে তিনি রাজনৈতিক ও সমাজ নেতা। অন্যদিকে, তার স্থলে সম্ভাব্য প্রভাবশালী দু’জন দুই মেরুর। হুগো শ্যাভেজের আদেশবাহী হিসেবেই তাদের কাজ করে যেতে দেখা গেছে সব সময়। সামরিক-বেসামরিক কোন খানেই তাদের আলাদা জনপ্রিয়তা নেই। তাই শ্যাভেজের অবর্তমানে দীর্ঘস্থায়ী ও সমাজতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর সামরিক-বেসামরিক স্বার্থগোষ্ঠীর সংঘাত অত্যাসন্ন। তবে আর যাই হোক ২১ শতকের সমাজতন্ত্রের জনক হুগো শ্যাভেজের মৃত্যু নেই। তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করে তা বিক্রির অর্থ দিয়েই তিনি মজবুত করেন সমাজতন্ত্রের ভিত্তি। নিশ্চিত করেন সুষম বণ্টন। এ কারণেই এর সুফল ভোগী ঐ অঞ্চলের দরিদ্র সংখ্যাধিক্যরা তাদের নায়ককে মনে রাখবে চিরকাল। শুধু ভেনিজুয়েলা বা লাতিন আমেরিকা নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তের নির্যাতিত মানুষের মনেও শ্যাভেজ থাকবেন জ্বলজ্বলে। কেননা মার্কিন অভিযানে আফগান শিশুর লাশের ছবি দেখিয়ে বর্তমান বিশ্বের কোন নেতা দ্ব্যর্থ কণ্ঠে বলার সাহস রাখেন, সন্ত্রাস দিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়া যায় না। পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ভালবাসা, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সমতা বিধানই ছিলো শ্যাভেজের বলিভারিয়ান সোশ্যালিজমের মূল মন্ত্র। যার ভিত্তিতে তিনি এমন একটি অর্থনৈতিক মডেল তৈরির চেষ্টা করেছেন, যেখানে একে অপরের প্রতি সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা, যৌথ ও ব্যক্তিগত সম্পদ সবই সামাজিক ও সাধারণ স্বার্থে ব্যয় হবে। শ্যাভেজ বলেছিলেন, একমাত্র গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রই পারে বর্তমান বিশ্বকে বাঁচাতে পারে। যেখানে মানুষ শুধু চার-পাঁচ বছরে একবার ভোট দিয়েই খান্ত হবে না, বরং একটি জীবন পদ্ধতি বাতলে নেবে ও নিজের দায়িত্ব-ক্ষমতা বুঝে পাবে। ভেনিজুয়েলার রাজনীতি বিশ্লেষক ও আইরিশ গবেষক বেরি ক্যাননের মতে, শ্যাভিজম গোঁড়া কোন মতবাদ নয়। বরং তা পরিবর্তিত হতে পারে প্রতিদিনই।