সংসদ অধিবেশনে উপস্থিতিই কাম্য

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৫
বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতেই নবম সংসদের ষোড়শ অধিবেশন শুরু হইল, চলিবে ৬ মার্চ পর্যন্ত। অধিবেশনগুলিতে বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দের নিয়মিত অনুপস্থিতি আমাদের বিকাশমান গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মধ্যে একটি নেতিবাচক প্রবণতায় পরিণত হইয়াছে। জনমনে সংসদের কার্যকারিতা লইয়া ভুল বার্তা পরিবেশিত হইতেছে। কারণ, অধিবেশনগুলির সরাসরি সম্প্রচার তাহারা দেখিতেছেন, দেখিতেছেন কেবলই সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধিদের বিতর্কহীন একপাক্ষিক আলোচনা। পত্রপত্রিকাগুলিতেও বিরোধী দলহীন নিষ্প্রাণ সংসদ লইয়া উদ্বেগপূর্ণ খবর প্রকাশিত হইতেছে। গত বত্সরের ১৮ মার্চ পার্লামেন্ট অধিবেশনের পরে বিরোধীদলীয় জোট আর সংসদে ফেরে নাই। অনুপস্থিতির উক্ত নজির জোরদার করিতেই যেন ১৩, ১৪, ১৫তম অধিবেশনের পুরোটাই বিএনপি ও শরিক দলগুলি বর্জন করিয়াছে, ১৬তম অধিবেশনও বর্জন করিল। হিসাব করিলে দেখা যাইবে, গত চার বত্সরে বিএনপি মোট ২৮২ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকিয়া সংসদের ইতিহাসে অনুপস্থিতির রেকর্ড গড়িয়াছে। অন্যদিকে, অষ্টম সংসদের পুরো মেয়াদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে তখনকার বিরোধীদল আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল ২২৩ দিন। সপ্তম সংসদে ৩৮২ দিনের মধ্যে ওই সময়ের বিরোধী দল বিএনপি অনুপস্থিত ছিল ১৬৩ দিন। পঞ্চম সংসদের ৪০০ কার্যদিবসে আওয়ামী লীগ বর্জন করিয়াছিল ১৩৫ কার্যদিবস। বিরোধীদলীয় নেতা গত চার বত্সরে সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র আট কার্যদিবস। অষ্টম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন ৪৫ কার্যদিবস। জাতীয় সংসদের কার্যউপদেষ্টা কমিটির গত ১৬টি সভায় কোনটিতেই যান নাই বিরোধী দলীয় নেত্রী। ইতোপূর্বে বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে আওয়ামী লীগ প্রধানও একই কাজ করিয়াছেন। অষ্টম সংসদে ২০০১ হইতে ২০০৬ পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। ওই সংসদে কার্যোপদেষ্টা কমিটির কোনো সভাতেই যোগ দেন নাই তিনি। বস্তুত, গত ১৬ বত্সরে কোনো বিরোধী দলীয় নেতাই সংসদের কার্যোপদেষ্টা কমিটির সভাতে যান নাই। স্পীকারের সভাপতিত্বে ১৫ সদস্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যোপদেষ্টা কমিটিতে রীতি অনুয়ায়ী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা সব সময় দুই ও তিন নম্বর সদস্য থাকেন। এইসব তথ্য নূতন ও গতিশীল নেতৃত্ব গঠন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিকাশের অনুকূল যে নহে, তাহা সহজেই অনুমেয়। বলাবাহুল্য, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করিতে অধিবেশন সাময়িক বর্জন সংসদীয় সংস্কৃতিরই অংশ। সকল দেশেই এই রেওয়াজ চালু রহিয়াছে। তবে কোনো একটি ইস্যু ধরিয়া বিরোধী দলগুলি অধিবেশন হইতে ওয়াক আউট করিলেও অচিরেই অন্যান্য ইস্যু লইয়া বিতর্ক করিতে তাহারা সংসদে ফিরিয়া আসেন। পার্শ্ববর্তী ভারতেও এরূপ প্রাণবন্ত সংসদীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়াছে। কিন্তু, অব্যাহত বর্জনের মাধ্যমে সংসদকে সম্পূর্ণরূপে সরকারের এখতিয়ারে ছাড়িয়া দেওয়ার সংস্কৃতি কেবল এইদেশেই সম্ভব হইতেছে। বিরোধী দলও বলিতে গেলে সরকারেরই অংশ। ষোড়শ অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানও বিরোধীদলের প্রতি সংসদে আসিয়া ভূমিকা রাখিবার আহ্বান জানাইয়াছেন। বস্তুত:সংসদকে প্রাণবন্ত বিতর্ক ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করিয়া তোলা সরকার এবং বিরোধী দল উভয়েরই দায়িত্ব। জনগণের এই দায় তাহাদেরই বহন করিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন