আপনদর্পণ

বাজলো কিরে ভোরের সানাই ...

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৩
জ্যৈষ্ঠকে বলা হয় মধুমাস। ফাল্গুনকে আমি বলি ফুলের মাস। যতো না ফুল ততোই তার খোশবু। শিউলী এখনো ফোটে, বকুল ঝরে পড়ে শীতের বাতাস নিয়ে, চামেলী, বেলী, চাঁপা, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, মাধবী সকলেই যেন বরণ করে নিতে চায় ঋতুরাজ বসন্তকে। এই ফাল্গুনে বেড়াতে যেতে হয় গ্রামের বাড়িতে। যেখানে টিনের চাল মাটির দেয়াল বাঁশের বেড়া মায়াবী আবেশ নিয়ে অপেক্ষা করছে আপনজনদের জন্য। শহরের চাকচিক্য বিলাস ভূষণ বড্ডই মেকি মনে হয়, আন্তরিকতার ছোঁয়া খুঁজে বেড়ায় তৃষিত মন। পথের কষ্ট, যানজটের যন্ত্রণা, ফেরিঘাটে আটকে থাকা এ যেন কিছুই নয়, যে মুহূর্তে পৌঁছে যাই নবীগঞ্জে, হবিগঞ্জের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। চারদিক থেকে কলরব খুশির আনন্দধ্বনি, যেন অসময়ের ফোঁটা কোন প্রিয় ফুল, অসময়ের পাকা ফল অথবা হঠাত্ করে আকাশে ভেসে ওঠা ঈদের চাঁদ। নিজেদের খুব ভাগ্যবান মনে হয় এই আত্মীয়-স্বজন পরিবৃত মায়াবী পরিবেশে। কেউ বালতি করে গরম পানি আনছেন গোসল করার জন্য, কেউ বা মাটির বদনায় অজুর পানি নিয়ে আসছেন, কেউ বা বেতের পাটি বিছিয়ে দিচ্ছেন। শর শর পাতার শব্দ শোনা যাচ্ছে, ঝিরিঝিরি আওয়াজে বইছে নারকেলের সরু সরু পাতা, কাঁচা ও পাকা সুপারি দুলছে মৃদু বাতাসে, মাচার ওপরে বেগুনি ফুলের শোভায় হালকা সবুজ সিমের গুচ্ছ, লতানো গাছে সবুজ বরবটি হলুদ ফুল পাশে নিয়ে সবুজ লম্বা লম্বা করলা। কাঠের গোল টেবিল, ফুল, লতাপাতা, পাখির নকশা তোলা সাদা টেবিল ক্লথ বিছানো হয়েছে শহর থেকে আগত মেহমানদের স্বাগত জানাতে। চারপাশে কাঠের চেয়ার টুল মোড়া টেনে নিয়ে সবাই বসে পড়লাম। ধোঁয়া ওঠা মোটা মোটা চালের রুটি, গরুর গোশতের সুরুয়া, মসলা দেয়া রুই মাছ ভাজা ও নলেন গুড়ের ক্ষীর। কে কতোটা রুটি খেলাম তার হিসেব নেই, যিনি অরুচিতে ভুগছেন কিছুই খেতে পারেন না, এখানে তিনিও মহানন্দে চারপাঁচটা রুটি খেয়ে ক্ষীরের বাটির দিকে হাত বাড়ালেন। এই তো আমার আশ্রয়, বেঁচে থাকার প্রেরণা, জীবনদাত্রী শক্তি, একে ছেঁড়ে পালাবো কোথায়। পরিবারগুলো সবই একান্নবর্তী দাদা-দাদি, ফুফু, চাচা, খালা, নানি, ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাতিজা-ভাতিজি, নাতি-নাতনি যেন দশরথের সংসার। এখানে মন কেমনের হাওয়া বওয়ার সুযোগ নেই। এতো আনন্দ, এতো খুশি এবং এতো আদবতমিজের শিক্ষা, বিপথে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পাঁচদিন পর নিজ শহরে ফেরার পথে বিষণ্ন চিত্তে ভাবি কেন আমরা মেয়েদের, শিশুদের, বালিকাদের জীবনে এতো ভয়াবহ জন্তুর মতো হানা দিই। নিরাপত্তা নেই, নিশ্চিন্তে পথ চলা নেই, মুক্ত হাওয়ায় দু’পা হাঁটার সুযোগ নেই। দিনে দিনে আমরা যেন অরণ্যে বাঘ-ভালুকের আস্তানায় চলে যাচ্ছি। মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা ভুল, প্রয়োজন ছাড়া ক্ষুণ্নিবৃত্তি নিবারণ করা ছাড়া কোনো জন্তু আরেক জন্তুকে হত্যা করে না। সভ্যতার মেকি পোশাকে তারা আবৃত নয়। আর মানুষ নামক সভ্যপ্রাণী সুবেশধারী হয়ে আক্রমণ করছে অবোধ সরল প্রস্ফুটিত কোমল হূদয়ের মেয়েদের। চোখের পানি মুছতে না মুছতেই আরেকটি খবর ছাপা হয় খবরের কাগজে। যে সরলা কিশোরী জগতকে দেখেছিল স্বপ্নময় আঁখি মেলে, তার স্বপ্ন চিরতরে বিলীন হয়ে গেল অসুরের থাবায়। অথচ আমরা ‘নারী দিবস’ ‘মাতৃ দিবস’ ‘কন্যা দিবস’ শ্লোগান তুলে বড় বড় হোটেল বা মিলনায়তনে হাজার হাজার টাকা অপব্যয় করে নিজেদের সভ্যতার জয় ঢাক বাজাই। এখন প্রয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্নমুখে নিজেকে ধাবিত করার। গোল টেবিল বৈঠক আজ অসার, আইনের প্রয়োগ অর্থহীন, প্রয়োজন আত্মাকে হূদয়কে মননকে বিশুদ্ধতার পানি দিয়ে সিঞ্চন করে পবিত্র করে তোলার। পুরুষ ও নারী একে অপরের পরিপূরক, নারীবিহীন জীবন, পুরুষবিহীন জীবন দু’টোই দাবদাহে জ্বলতে থাকবে, যদি ভারসাম্য না আসে। আমরা জানি, কোনো সত্ উদ্দেশ্যই বিফলে যায় না। সময় হয়ত লাগে, তবু চেষ্টা অবিরাম চলতে থাকলে একদিন না একদিন পরিবর্তন আসবেই। আমরা আশা করে থাকবো, সেই নবীন সূর্যোদয়ের যেদিন মেয়েরা নির্ভয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে মাটির পৃথিবীতে বিচরণ করতে পারবে নিজের ছোট্ট চেষ্টার কলিটিকে প্রস্ফুটিত করার আবেগ নিয়ে। লেখক :শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন