মম উপাখ্যান

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ১৯:৪৮
সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ ইচ্ছে করলেই নিজের কাঙ্ক্ষিত জায়গায় অবস্থান করতে পারেন। এমনটিই বিশ্বাস করেন জাকিয়া মম। আর তার এই ভাবনাই তাকে আজকের সফল টিভি অভিনেত্রীদের মাঝে দাঁড় করিয়েছে। প্রতিভাময়ী এই অভিনেত্রীর বর্তমান কাজ ও আগামীর ভাবনা নিয়ে আমাদের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ সংস্কৃতি চর্চার প্রথম দিকে মম কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তার মা তখন মফস্বল থেকে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসতেন নাচ শেখার জন্য, সে সময় বিষয়টি স্থানীয় অনেকেই সহজ করে নেননি। অনেকেই তাদের দিকে বাঁকা চোখে তাকাতেন। তবে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে মম সব সময় তার বাবার কঠিন সমর্থন পেয়েছেন বলে তেমন কোনো অসুবিধা অনুভব করেননি। মম বললেন, ‘আমার আজকের অবস্থান দেখে স্থানীয় অনেকেই আমার বাবা-মা’কে বাহবা দেন। কিন্তু ওই সময় অনেকেই আমাকে কটূকথা বলতেন। আমি এর কোনো প্রত্যুত্তর করিনি। আমার চেষ্টা ছিল কাজ দিয়ে তার জবাব দেওয়ার। আমি তো জানতাম যে, আমি সত্ভাবে কাজ করছি, সফলতা আসবেই।’ মম সফলতা পেয়েছেন। আমাদের এই সময়ের টিভি অভিনেত্রীদের মধ্যে অনেকেই মমকে একটু আলাদা জায়গায় রাখেন। নিজের পড়াশোনাটাও নাটক নিয়ে করেন বলে মমর সারাবেলাটা কাটে নাটকের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করে। মম তার সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব দিতে চান কাকে—এমন প্রশ্ন শুনে সময় না নিয়েই তিনি বলেন, ‘ক্যারিয়ারের জন্য প্রথমেই বলতে হবে আমার পরিবারের কথা। আমাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিতে আমার বাবা-মায়ের চেষ্টা ছিল প্রবল। এরপর আমি বলতে চাই আমার নাচের গুরু কবিরুল ইসলাম রতনের কথা। তার কারণে আমি মিডিয়াতে অনেক সহযোগিতা পেয়েছি কাজ করতে গিয়ে। আমি আমার বাবার কাছে আবৃত্তি শিখেছি। এ ছাড়া আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনের অবদানও কম নয় আমার পেছনে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেই আমি নাচ-গান শিখেছি। তা ছাড়া লাক্সের পর যেসব নির্মাতাদের ভালো ভালো নাটকে আমি কাজ করেছি তারাও আমার আজকের অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন দর্শকরা। কারণ তারা আমাকে গ্রহণ না করলে অন্য অনেকের মতো আমিও হারিয়ে যেতাম অপরিচিতির অন্ধকারে।’ খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের কাহিনি নিয়ে তৌকীর আহমেদের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ‘দারুচিনি দ্বীপ’ চলচ্চিত্রটি। এতে কাজ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন মম। এরপর ‘স্বর্ণমায়া’, ‘বিবর’ ও ‘নীড়’সহ বেশকিছু নাটক ও টেলিফিল্মে কাজ করে অভিনেত্রী হিসেবে মম নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু তার পরও এই তিনি অতৃপ্তির কথাই বলেন জোরেশোরে। মমর কথায়, ‘আমি আসলে একজন ভালো অভিনেত্রী হতে চাই। আর সেজন্য আমি প্রতিটি মুহূর্ত পার করছি শেখার মধ্য দিয়ে। অভিনয়টা আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে। আমি তিন বছর বয়স থেকেই অভিনয় করছি। অভিনেত্রী হিসেবে আমার টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে ‘নীড়’ ধারাবাহিকটি। এই নাটকের আয়শা চরিত্রটি দর্শকদের সাথে আমাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। চরিত্রটি আমি এখনও খুব খুব মিস করি। আমি মম থেকে যে দর্শকদের আয়শা হতে পেরেছি এজন্য একধরনের ভালোলাগা অনুভব করেছি। সেদিন একজন নারী দর্শকের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার আমার আয়শা হয়ে যাওয়ার গল্পই জানতে চেয়েছিলেন। নিজের কাজের ক্ষেত্রে আমি কখনোই আপস করতে চাই না। আমার কাছে অনেক স্ক্রিপ্ট আসে। এরমধ্যে যে চরিত্রটি আমার পছন্দ হয় আমি কেবল সেটাই গ্রহণ করি। আমি আমার এখনকার কাজগুলোকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাই। আমি দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই কাজ করি। আমার দর্শকরাই আমার কাজের শক্তি তারা আমাকে ভালোবাসা দিয়ে আজকের অবস্থানে এনেছেন। আর এই কারণে আমি নিজের কাজের ব্যাপারে আগের চেয়ে আরও সচেতন হয়ে গেছি। এখন আমি ওই চরিত্রগুলোকেই প্রধান্য দিই, যেখানে অভিনয়ের অনেক সুযোগ আছে। একই টাইপের চরিত্রে বারবার কাজ করতে আমি আগ্রহ পাই না। আমার মনে হয়, আমার দর্শকরাও তাদের মমকে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে আবিষ্কার করতে চান। আমি দর্শকদের ভালোবাসা ধরে রাখতে চাই। তাদের আগামীতে আরও ভালো ভালো কাজ উপহার দিতে আমার চেষ্টার কোনো কমতি থাকবে না।’ কথায় আছে—যিনি রাঁধেন, তিনি চুল বাঁধেন। তেমনি অভিনেত্রী মম সংসার ও অভিনয় দুটোই সামলাচ্ছেন সিদ্ধহস্তে। বিশিষ্ট নাট্যপরিচালক এজাজ মুন্নার স্ত্রী এখন উদ্ভাসের জননী। আপাদমস্তক সংসারী মম কাজের ফাঁকে ফাঁকে এখন সন্তানের খোঁজখবরও রাখেন। মমর জবানীতে, ‘আমি আমার সবগুলো জায়গাতেই সমান মনোযোগ দিয়ে থাকি। আমার একমাত্র ছেলে ‘উদ্ভাস’ হচ্ছে আমার সমস্ত দুনিয়া। ছেলের সাথে আমি যখন খেলা করি, তখনকার আনন্দটা বর্ণনাতীত। আর আমার স্বামী এজাজ মুন্না যেমন আমার প্রতি কেয়ারিং তেমনি আমিও তার প্রতি। সত্যি বলতে কী, দাম্পত্যজীবনে আমি অনেক সুখেই আছি। মুন্না কখনোই আমার কাজকে কোনোভাবেই প্রভাবিত করার চেষ্টা করে না। আমিও তার মতো আচরণ করি। তবে আমরা একজন অন্যজনের কাজের যৌক্তিক সমালোচনা করি। আমাদের নিজেদের কাজের ব্যাপারে আমরা দুজনেই দুজনের সাথে শেয়ার করি। সে মিডিয়াতে আমার অনেক আগে এসেছে। তাই ওর অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। একজন অভিনেত্রী হিসেবে যদি বলি, এজাজ মুন্না অনেক মেধাবী একজন নাট্যকার ও পরিচালক। ওর কাজের মাঝে সব সময় নতুনত্ব রয়েছে। কাজগুলো সব সময় অনেক বেশি সৃজনশীল হয়ে থাকে। সব সময়ই কাজের ক্ষেত্রটিকে গতানুগতিকতার অনেক ঊর্ধ্বে রাখে। ওর ভাবনাগুলো সব সময় দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পৃক্ত।’ অনেকের মাঝেই একটা ধারণা আছে যে, গ্ল্যামার মিডিয়ায় কর্মক্ষেত্রে মেয়েরা বাড়তি সুবিধা পায়। আপনি কি মনে করেন যে, একজন মেয়ে হিসেবে আপনি কোনো বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে মম বলেন, ‘আমি কখনোই বাড়তি সুবিধা নেয়ার নীতিতে বিশ্বাস করি না। আমি যদি কারো কাছ থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা নিতে যাই, তাহলে তাকেও তো আমার কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে হবে। সত্যি বলতে কী, কেউ যদি আমাকে বাড়তি কোনো সুবিধা দিতেও চায়, তবে আমি তা নেব না। কারণ বাড়তি সুবিধার কিছু অসুবিধাও আছে।’ আচ্ছা সহকর্মী হিসেবে ছেলে কিংবা মেয়েতে কি কোনো প্রভেদ আছে বলে আপনি মনে করেন? তার সাবলীল উত্তর—‘আমি আমার একজন সহকর্মীকে সহকর্মী হিসেবেই দেখি। ছেলে বা মেয়ে বলে আলাদা করে ভাবিনা। তবে কাজ করতে গিয়ে সেই মানুষটি বয়সে আমার বড় হলে যেমন তাকে সালাম করি, তেমনি ছোট হলে ‘ওয়েলকাম’ জানাই।’ ‘ওয়ার্কিং এনভায়রনমেন্ট’-এ কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়েদের পৃথক সহায়তার প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন? উত্তরে এই লাক্সতারকা বলেন, ‘আসলে আমরা মেয়েরা তো একটু আদরের কাঙ্গাল। মেয়েদের প্রতি কর্মক্ষেত্রে কেয়ারিং’টা একটু বাড়াতে হবে। কোনো মেয়ে যখন কোনো অফিসে কাজ করবে, সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে তার বসার রুমটা যেন সুন্দর হয়। সহকর্মীরা তাকে যেন মেয়ে নয়, মানুষ হিসেবেই ভাবেন। কারণ মেয়েদের যা দেয়া হয়, তার ‘রেজাল্ট’ তারা অনেক বেশি দেয়। একজন শিক্ষিত মা যেমন একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দেয়, বিষয়টি ঠিক তেমনই।’ক্যারিয়ারের কারণে সামাজিক বা পারিবারিক দায়িত্ব পালনে কী কখনও কোনো অসুবিধার সম্মুখীন হন? ‘আমার তা মনে হয় না। আমি আমার মায়ের কথাই যদি বলি, তিনিও একজন কর্মজীবী নারী। আমি ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে এসেছি পরিবার সামলানোর পাশাপাশি কলেজের অধ্যাপনাও ঠিক রেখেছেন। এমনকি সামাজিক কাজেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। এ জন্য তার প্রস্তুতিটাও ছিল আলাদা। কর্মজীবী বলে তিনি কখনও যেমন পারিবারিক দায়িত্বকে অবহেলা করেননি, তেমনি পরিবারকে সময় দিতে গিয়ে কর্মকে। আমি আমার মাকে সব সময় অনুসরণ করি।’ অন্যদের মতো মমও তার পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে ভাবেন। নতুন প্রজন্মকে পরামর্শ দেওয়ার প্রসঙ্গটি তার সামনে তুলে ধরতেই তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, অভিনয়, মডেলিং বা অন্য কোনো কাজ—যে যেই কাজই করুক না কেন, প্রথমেই কাজটাকে খুব বেশি ভালোবাসতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গেলে হয়তো পরিবার থেকে সামান্য বাধা আসতে পারে। তা সুন্দরভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে কাজের সাফল্যের মাধ্যমে। আমি মনে করি, প্রত্যেকটি মানুষেরই পরিশ্রমের নির্দিষ্ট একটা বয়স থাকে, ওই সময়টা ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেকে নিয়ে যেতে হবে স্বপ্নের জায়গায়।’ ছবি ইকবাল আহমেদ ফটোগ্রাফি