মিসর পরিস্থিতি

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩০
২০১১ সালের ন্যায় মিসর আবার অগ্নিগর্ভ হইয়া উঠিয়াছে। শ্লোগানে শ্লোগানে এবং পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলিতে আহত মানুষের আত্মচিত্কারে রাজপথ হইয়া উঠিয়াছে প্রকম্পিত। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী কয়েকটি শহরে রাত্রিকালীন কারফিউ ও জরুরি অবস্থা ভাঙিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করিয়াছেন সরকার বিরোধীরা। পোর্ট সৈয়দে বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি থানায় হামলা চালাইলে সহিংসতায় দুই ব্যক্তি নিহত হন। সব মিলাইয়া গত বৃহস্পতিবার হইতে এ পর্যন্ত ৫২ জন প্রাণ হারাইয়াছেন বলিয়া জানা যায়। গত বত্সর নূতন সরকার ক্ষমতায় আসার পর একটি ফুটবল স্টেডিয়ামে মর্মান্তিক সহিংস ঘটনা ঘটে যাহাতে ব্যাপক হতাহত হয়। এই ঘটনায় আদালত ২১ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিলে সরকার বিরোধীরা রায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামিয়া আসেন। এইভাবে নূতন করিয়া মিসর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হইয়া উঠে। এখন মিসরের কোথাকার জল কোথায় গিয়া দাঁড়ায় তাহাই ভাবিবার ও দেখিবার বিষয়। হোসনি মোবারকের পতনের দুই বত্সর পূর্তিতে সরকার যখন পাঁচ লক্ষ বৃক্ষ রোপণ, দুই হাজার স্কুল সংস্কার ও হাসপাতালে রোগীর চিকিত্সাসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই দিবসটি স্মরণীয় করিবার উদ্যোগ নেয়, তখনই মিসরের রাজপথে সহিংস ঘটনার অবতারণা হয়। তাহার সহিত মিসরের সামরিক বাহিনীর প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির সাম্প্রতিক কথাবার্তায় সন্দেহ ও সংশয় বাড়িতেছে। ইতোমধ্যে আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে আরেকটি বিপ্লবের আশংকা ব্যক্ত করা হইয়াছে। সেনাপ্রধান গত মঙ্গলবার ফেসবুকে নিজের অ্যাকাইন্টে মন্তব্য করেন যে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে মিসরের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়ার উপক্রম হইয়াছে। সংঘাতের কারণে দেশটি ধ্বংসের মুখে যাইতেছে যাহা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য হুমকি স্বরূপ। অন্যদিকে পোর্ট সৈয়দ ও সুয়েজ শহরে সেনাবহিনী জানমাল রক্ষায় কারফিউ কার্যকরে তেমন কোন ভূমিকা পালন করে নাই এমন অভিযোগও উঠিয়াছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখিয়া গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি বিরোধী দলকে সংলাপের আহ্বান জানান। কিন্তু তাহা প্রত্যাখ্যান করে প্রধান বিরোধী দলগুলির জোট ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট (এনএসএফ)। একমাত্র উদারপন্থি নেতা আইমান নূর ছাড়া গত সোমবারের ঐ বৈঠকে আর কেহ অংশগ্রহণ করেন নাই। এনএসএফের অন্যতম নেতা মোহম্মদ এল বারাদি ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হামদিন সাবাহি প্রেসিডেন্টকে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করিবার আহব্বান জানাইয়াছেন। এইসব অবস্থা দৃষ্টে মনে হইতেছে, আগামী নির্বাচন যতই ঘনাইয়া আসিবে, ততই মিসরে সংঘাত বাড়িতে থাকিবে। আরব বসন্তের জোয়ারে দুই বত্সর আগে তাহরির স্কোয়ারে সমবেত লক্ষ লক্ষ জনতার আন্দোলন ও প্রায় এক সহস্র মানুষের আত্মদানের মাধ্যমে লৌহমানব ও স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন হয়। ইহার পর নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়া মিসরে অনুষ্ঠিত হয় পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। মিসরের সাধারণ মানুষ এই প্রথম শান্তিপূর্ণ উপায়ে ও নির্ভয়ে তাহাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অনন্য সুযোগ লাভ করেন। এই দুই নির্বাচনই আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষত পশ্চিমা মহলের স্বীকৃতি লাভ করে। ক্ষমতায় আসে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। তাহাদের নূতন প্রেসিডেন্টকেও অনেকে স্বাগত জানান। কিন্তু সংবিধান প্রণয়নে ইসলামি ভাবাদর্শ অনুসরণ, প্রেসিডেন্টের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ, মোবারক বিরোধী বিপ্লবের সহিত তাহার বিশ্বাসঘাতকতা, অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙুর ইত্যাদি অভিযোগে কম জনপ্রতিনিধিত্ব থাকিলেও সরকারবিরোধীরা সরকারের সাত মাসের মাথায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এইসব ঘটনায় শক্তিশালী সেনাবাহিনী যাহারা দেশটির ৪০ ভাগ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ও আদালত কলকাঠি নাড়িতেছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। তবে যে কোন নূতন গণতান্ত্রিক দেশে নানা বাধা-বিপত্তি দেখা দিবে ইহাই স্বাভাবিক। এইসব দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। বলাবাহুল্য, আমরা যে কোন দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে গণতন্ত্র চর্চার পক্ষপাতী।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন