রবি ঠাকুরের একটি গান শুনছিলাম। গানটি আমাদের প্রায় সবারই পরিচিত এবং অনেকের নিকট প্রিয়। গানটি হলো “মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে......”। যখন কর্ণকুহরে গানটি প্রবিষ্ট হচ্ছিল তখন চোখের পাতা নিবিষ্ট ছিল পত্রিকার পুরোনো পাতায়। এলোমেলো মনে পত্রিকার এ পাতা থেকে ও পাতায় দৃষ্টি এগোচ্ছে। হঠাত্ থমকে গেলাম; তত্ক্ষণাত্ই আবার আতঙ্কিত হলাম। কমিশনার জাভেদ আলীর সাথে সাংবাদিকদের আলাপচারিতা পড়ে থমকে গেলাম। একই ভয়ঙ্কর সুসংবাদ। নির্বাচন কমিশনার জাভেদ আলী জাতিকে সুসংবাদ দিচ্ছেন সুষ্ঠু নির্বাচনের নিমিত্তে কমিশন কর্তৃক ব্যাপক আয়োজন গ্রহণের। এ আয়োজনে বর্তমান সংসদের সদস্যগণ স্বীয় পদে আসীন থেকেও নির্বাচন করতে পারবেন। তবে তার বক্তব্য কোনো দল নির্বাচনে না আসলেও তারা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবেন। কিন্তু যে সংবাদটি পড়ে আতঙ্কিত হয়েছি সেটিতে আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে শিরোনাম করা হয়েছে। দীর্ঘ নয় বছর শাসনকারী এই অভিজ্ঞ রাষ্ট্রপতি একটি অশনি সংকেত দিয়েছেন। এরশাদ সাহেব মনে করেন নির্বাচনে বিএনপি না এলে আবারো ওয়ান ইলেভেন হবে। ফখরুদ্দিন আহমেদের ওয়ান ইলেভেন যারা দেখেছেন তারা সবাই হয়তো এই সংবাদটি পড়ে আতঙ্কিত হবেন। সামরিক বাহিনীর এই দুই সাবেক কর্তাব্যক্তির বক্তব্যের ভিন্নতা দেখে মনে হলো সত্যিই রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ বলেছেন—“মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে”। নির্বাচন কমিশনার বললেন, কোনো দল নির্বাচনে না আসলে (ওয়ান ইলেভেন তো দূরের কথা) নির্বাচনই সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব। অন্যদিকে এরশাদ সাহেব মনে করেন নির্বাচনে কোনো দলের অনুপস্থিতি ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি করবে। এতক্ষণে নিজের অজান্তেই রাজনৈতিক ভাবনায় অনেক দূর এগিয়ে গেছি। জাভেদ আলী ও এরশাদ সাহেবের কথায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়ে যে জটিল সংশয় দানা বেঁধেছিল তা আরো জটিল হয়ে উঠলো রবি ঠাকুরের আরেকটি গান বেজে উঠতেই। হঠাত্ মনোযোগ ফেরাতেই বাজতে শুনছি ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে........’। শেয়ার মার্কেটে ধস, হলমার্কের কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু, পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড, রাজপথে খুন— এসবের কারণে বাংলাদেশের আকাশে মেঘ জমে আছে আগে থেকেই। সেই মেঘের পরে আবারো মেঘ জমে যখন শুনি বিরোধী দল ছাড়াই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বা নির্বাচনে বিএনপি না আসলে নতুন এক-এগারো সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা, আর তখনি বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রের গান কানে ‘বাজে করুণ সুরে’।
কমিশনার সাহেব আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে, নির্বাচন নানা কারণেই অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় বা অব্যাহত থাকে, তেমনি নির্বাচনের কারণেই গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্টিংটন সাহেব ওয়ার্ল্ড পলিটিক্সে ‘পলিটিক্যাল ডেভলপমেন্ট ও পলিটিক্যাল ডিকে’ শিরোনামে লেখা নিবন্ধে দেখিয়েছেন কীভাবে কখনো কখনো নির্বাচন অনুষ্ঠান রাজনৈতিক উন্নয়নের কারণ না হয়ে রাজনৈতিক মৃত্যুর কারণ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া-আফ্রিকায় কর্তৃত্ববাদী শাসন এসেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেছে নির্বাচনের কারণেই। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশে ২০০৬ সালে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপূর্ণ আচরণের অভাবেই ফখরুদ্দিন আহমেদের কর্তৃত্ববাদী শাসন এসেছিল সেটা আপনি ভুলে যান নাই নিশ্চয়ই। সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রায়নের প্রাথমিক ধাপ হলেও কোথাও কোথাও অগণতান্ত্রিক সরকার বা ব্যক্তিগত একনায়কত্ব রক্ষায়ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। এরশাদ সাহেবের আমলে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে সেগুলো কতটুকু গণতন্ত্র রক্ষা করতে পেরেছে? তাছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশে তো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদেশিদের চাপে। ১৯৯২ সালে ঘানায় এবং ১৯৯৫ সালে তানজানিয়ায় যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র একনায়কত্বকে গোপন করা। তাই নির্বাচন কমিশনারকে বিনয়ের সাথে বলতে চাই, কোনোভাবেই কোনো দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন করা যাবে না। নির্বাচন কমিশন একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটিকে অবশ্যই নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরূপে দায়িত্বরত কেউ যদি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মতো বক্তব্য প্রদান করেন তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিষয়ে আরো হতাশ হয়ে পড়ি। অন্যদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করি যে, আমাদের আর ভয় দেখাবেন না। আপনার দলও মহাজোটের সদস্য। সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে আপনিও তো যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখাতে পারেন।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক দল বিষয়ে গবেষণা করেন এমন সকল রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এ ব্যাপারে একমত যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য আবশ্যক শর্ত। তাই শক্তিশালী, গতিশীল রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা নতুন গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যক। ঐতিহ্যগতভাবেই উদার গণতন্ত্রে রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী মধ্যবর্তী সংগঠন হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোই ভূমিকা রেখে আসছে। অনেকে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মূল চাবিকাঠিই মনে করেন রাজনৈতিক দল ব্যবস্থাকে। এখানে কোনো দলের অনুপস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান বা এ কারণে ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রাজনৈতিক দল ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরো দুর্বল করবে এবং সর্বোপরি ধ্বংসও করতে পারে। দল ব্যবস্থা দুর্বল হলে এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রবল হলে নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার আশংকাই বেশি। খবরের কাগজে পরিবেশিত সংবাদ অনুযায়ী মনে হয় যেন জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ পণ করেছে। এটা ভালো। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা রয়েছে। তবে সেটা সকল দলের অংশগ্রহণ ছাড়া হলে গণতন্ত্রের ‘মুখ রক্ষার’ নির্বাচন হবে; গণতন্ত্রায়নের জন্য হবে না। তাছাড়া বাংলাদেশে যেখানে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার পরও অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্যগণ ক্ষমতার মহড়া প্রদর্শন করেন সেখানে বর্তমান সংসদের সদস্য থেকে যদি তারা নির্বাচন করেন সেই নির্বাচনে জনগণ কী অবস্থা দেখবে তা ভবিষ্যত্ই বলে দিবে। একইভাবে যেখানে ভেঙ্গে দেয়া সংসদের নির্বাচন করতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা বাংলাদেশের সংবিধানে করতে হয়েছে সেখানে নিজের সরকারের অধীনে, নিজে সংসদ সদস্য থেকে, নিজের এলাকায় নতুন সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আর সে নির্বাচন সুষ্ঠু করা যাবে এই প্রত্যাশা এতই কী সহজ? বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সরকারে থাকা অবস্থায় নেতাদের ব্যাপক দুর্নীতি রোধ করতে পারে না, অঙ্গ সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল সারাতে পারে না; কিন্তু নির্বাচনের সময় তারা তাদের নেতাদের নিবৃত্ত রাখতে পারবে সেই নেতাদেরই স্বার্থের বিরুদ্ধে সেটা আমাদের বোধগম্য হয় না।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের কৃষক, শ্রমিকের স্বপ্ন কবে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট যে কোনো অচলাবস্থা সাধারণ মানুষের সেই স্বপ্ন অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো আন্তরিকতাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় চোখে পড়ছে না। তাই মনে হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্রে যেন চলছে ‘রোদন ভরা এ (এক) বসন্ত’।
লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল:[email protected]
