গত ২৭ জানুয়ারি সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও একইভাবে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরো বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কী নেবে না, তা তাদের ব্যাপার। গত ২৩ জানুয়ারি রাজধানীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনেও তিনি অনুরূপ বক্তব্য দেন।
চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সদ্য সমাপ্ত বছরের শেষদিন যে আশার বাণী শোনান, প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত বক্তব্যে তা মরীচিকার ন্যায় মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ সচিবালয়ে তার নিজ দফতরে সাংবাদিকদের বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে ভেতরে ভেতরে আলোচনা চলছে। এখন তাদের কাছ থেকে সাড়া পেলে শিগগির আলোচনা শুরু হবে। আলোচনার পর আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সব দল অংশ নেবে। তার এ বক্তব্যের জবাবে বিএনপি সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসার আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, সে সংলাপ হতে হবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফর্মুলার ভিত্তিতে। বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য আলোচনার ওপর জোর দেন।
আগামী সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা ও নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ঘোষণা একাধিক কারণে তার পূর্বের ঘোষণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এক. রাজনীতিতে চলমান সংকট সমাধানের উপায় হিসাবে প্রধানমন্ত্রী গত ৩০ জুলাই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে সংসদ নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে ‘অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারে বিএনপিও অংশগ্রহণ করতে পারবে। নির্বাচনের সময় সরকার গঠনে বিরোধী দল যদি অংশীদারিত্ব চায় সেটা দিতে পারি। সবাই মিলে আমরা নির্বাচন করতে পারি। একটা ছোট মন্ত্রিসভা করে ইলেকশন করতে পারি।’ এজন্য সংসদে এসে বিএনপিকে প্রস্তাব দেয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। দুই. বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিরোধী দল বিএনপি ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দলগুলোর আপত্তির কারণে প্রধানমন্ত্রী গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদকে জানান, সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন সম্পর্কে বলা যায় যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের অনুসারী বিশ্বের কোনো দেশেই সংসদ বহাল রেখে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির নেই। গত ৯ জুলাই দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিষয়টি নিয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, সমঝোতার বদলে আওয়ামী লীগ এমন হার্ডলাইনে কেন? এ ব্যাপারে বিশ্লেষকদের মত হলো ---এক. গত ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাত্কারে সংসদ নির্বাচনকালে বিরোধী দলের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দেয়ার পর গত ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে। এতে অনির্বাচিত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করা হয়। বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যগণ দ্বারা গঠিত হবে। এ রায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে উজ্জীবিত করে তুলেছে। দুই. আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার মনে করছে, আন্দোলন করে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে বাধ্য করতে পারবে না। তাদের সে শক্তি নেই। বরং আওয়ামী লীগের পাশাপাশি সরকারের শক্তি দিয়ে বিরোধী জোটের আন্দোলন দমন করা যাবে বলে মনে করে সরকারের বড় একটি অংশ। তাই সমঝোতার বদলে তারা হার্ডলাইনে। পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা। এমনকি বিএনপি অংশ না নিলেও সরকারের বড় একটি অংশ নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে রাজি।
এদিকে গত ২৯ জানুয়ারি রাজধানীতে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বিএনপি নেতারা বলেছেন, সরকার যদি নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে না নেয়, তাহলে যথাসময়ে আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আর এর মধ্য দিয়ে রাজপথেই এ সংকটের সমাধান হবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের মূল্যায়ন, সরকারের জনসমর্থন যে অবস্থায় এসে পড়েছে তাতে মেয়াদের শেষদিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিলেই সরকারকে চাপের মুখে ফেলা যাবে। চাপের মুখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করা গেলে নির্বাচনী জোয়ার এমনিতেই বিএনপির পক্ষে যাবে। ফলে নির্বাচন প্রস্তুতি নয়, আন্দোলনই আপাতত মুখ্য বিএনপির কাছে। দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চার্জশিট বা তাকে সাজা দেয়ার উদ্যোগ প্রসঙ্গে বিএনপির মূল্যায়ন হল:এগুলো শেষ পর্যন্ত জনমতের চাপে কিছুই টিকবে না। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি তাই আন্দোলনের পথেই অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতী। সরকারের শেষ সময়ে আন্দোলনকে তারা গতিশীল রূপও দিতে চায়। বিএনপি নেতারা মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেয়া তাদের জন্য অর্থহীন। ফলে টেকসই আন্দোলনের পথ ধরে সরকারকে চাপে ফেলতে বড় ধরনের ঝুঁকি নেয়ার প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। দলটির নেতাদের মতে, সমঝোতা না হলে যা ঘটার ঘটবে; কিন্তু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে পিছু হটা যাবে না।
এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজনীতিতে সংঘাত অনিবার্য কি-না এবং সংঘাত হলে আবারো ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে কি-না তা নিয়ে রাজনীতিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষকরা বক্তব্য দিয়েছেন। সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়ছে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে আর আওয়ামী লীগ তা চাইছে না। দুই দলের এমন অবস্থানের কারণে দেশে আবারো ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তিনি আরো বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে না এলেও হয়তো নির্বাচন হবে; কিন্তু ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় আছে।
সুশীল সমাজের অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা হলো গণতন্ত্রের সমস্যা। এখানে গণতন্ত্র ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আর এ জন্য অরাজনৈতিক শক্তি যতটা দায়ী, রাজনৈতিক শক্তি তার চেয়ে কম দায়ী নয়। বরং বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের কারণে অরাজনৈতিক শক্তিকে সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে দেশে আবার নতুন করে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থা দূর করা না গেলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ শঙ্কামুক্ত হবে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পারস্পরিক আস্থার সংকটে নিপতিত। সে কারণে সমঝোতার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি যাচ্ছে খারাপের দিকে। তারা মনে করছেন, একের পর এক মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে জড়ানো, জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়ার ঘটনা এবং আগামী সংসদ নির্বাচনকালে সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ ঘোষণা সরকারের কঠোর অবস্থানে থাকার ইঙ্গিত বহন করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজনীতিতে সংঘাত অনিবার্য বলে মনে করছেন তারা।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের পুনরাবৃত্তির আশংকা করেছে আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকা। গত আগস্টে সংখ্যায় ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের কারণে বড় দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে ২০০৬ সালের মতো দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থাও দেখা দিতে পারে।
বড় দুই দলের কেন এই আত্মহনন? তারা কি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে না? তারা কী জানে না যে, তাদের একগুঁয়েমির জন্য তারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বিপন্ন হবে কষ্টার্জিত গণতন্ত্র। লাভবান হবে অগণতান্ত্রিক শক্তি। জনগণ আশা করে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির শিগগির বোধোদয় হবে, তারা সংকট সমাধানে আলোচনায় বসবে। খুঁজে বের করবে সংকট সমাধানের উপায়। ফলে রক্ষা পাবে গণতন্ত্র, রক্ষা পাবে তারা নিজেরাও।
লেখক : সাবেক সচিব
ঊ-সধরষ: ষধঃরভস৪৩্তমসধরষ.পড়স
