মেধাবীদের ছাত্র রাজনীতিতে আসতে হবে

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৯
শিক্ষাই উন্নতি-অগ্রগতির চাবিকাঠি এবং ছাত্ররাই একটি জাতির ভবিষ্যত্। কোন দেশের সামগ্রিক উন্নতি-অগ্রগতি নির্ভর করে সে দেশের সঠিক নেতৃত্বের উপর। একটি দেশ বা জাতিকে সঠিক দিক-নির্দেশনা না দিতে পারলে তার ধ্বংস অনিবার্য। দিক-নির্দেশনা তথা নেতৃত্ব যদি সঠিক পথে হয় তবে সে জাতির অগ্রযাত্রাকে কেউ রুখতে পারে না। এজন্য দরকার একদল সত্, কর্তব্যপরায়ণ, দেশপ্রেমিক, দক্ষ ও কর্মঠ জনশক্তি। যারা দেশকে উন্নতি-অগ্রগতি ও শান্তি-সমৃদ্ধির পথে পরিচালনা করবে। আজকের ছাত্ররাই আগামিতে জাতির কর্ণধার হবে, দেশ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং তারা যদি একজন দক্ষ সংগঠক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে দক্ষ পরিচালকের ভূমিকা পালন করতে না পারে; তাহলে এ জাতি বা দেশের সামনের দিকে হতাশা ছাড়া আর কিইবা অপেক্ষা করতে পারে? ছাত্রজীবনকে বলা হয় জীবনের বীজ বপনের সময়,ভবিষ্যত্ জীবন গঠনের সময়। এ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি তারা আপন দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে গিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়, তাহলে আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দেবার মত প্রয়োজনীয় জনশক্তি মঙ্গল গ্রহ থেকে আমদানী করা ছাড়া উপায় থাকবে না। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংগ্রাম আর অব্যাহত আন্দোলনের ফসল হলো আজকের এই বাংলাদেশ যার প্রতিটি আন্দোলনেই ছিল ছাত্রসমাজের গৌরবময় ভূমিকা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৯’এর গণ-অভ্যুত্থান ৭১’-এর স্বাধীনতার সংগ্রাম, ৯০’-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সর্বোপরি, জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্রদের অবদান অনস্বীকার্য। ছাত্ররাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতি একেবারে আলাদা। তবে আজকের দিনে পরিসরগত এবং বয়সগত তারতম্য ছাড়া তেমন মৌলিক তারতম্য চোখে পড়ে না। ছাত্র সংগঠনগুলো আজ সর্বদাই লেজুড়বৃত্তিতে লিপ্ত। তারা ছাত্রদের কল্যাণের কথা বাদ দিয়ে তাদের প্রভুদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। নির্দিষ্ট পরিসরে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির আলোকে পরিচালিত ছাত্রসমাজের কল্যাণের স্বার্থে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামকেই আমরা ছাত্রজারনীতি বলে থাকি। অতীতে ছাত্রসমাজ দেশ ও জাতির চরম ক্রান্তিলগ্নে, সংকটময় মুহূর্তে গৌরবময় ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে তারা দেশ ও জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অব্যাহত নেতিবাচক আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অভিভাবকমণ্ডলী, শিক্ষকমণ্ডলী, সচেতন ছাত্র-ছাত্রী তথা সর্বস্তরের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। তারা জাতিকে করেছে হতাশাগ্রস্ত। এখন ছাত্ররাজনীতি মানে নিজেদের মাঝে গ্রুপিং-লবিং, অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রতিপক্ষের সাথে মারামারি, চর দখলের মত সিট দখল,হল দখল, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি। ছাত্রনেতারা কোনভাবে একবার কর্তৃত্ব হাতে পেলে আদুভাই হিসেবে আজীবন কাটিয়ে দেবার চেষ্টা করে। ফলে ছাত্র নামধারী অছাত্র ছাত্ররাজনীতিতে নেতা সেজে বসে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ডাইনিংয়ে ফাও খাওয়া, খুন, ধর্ষণ এগুলো তাদের রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। যার প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিচয় সুষ্ঠু বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তারা এ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং জ্বলজ্যান্ত মানুষের গায়ে চাপাতি মারতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী গত চার বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৫০০ ছোট-বড় সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষের কারণে অন্তত ৬০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ৮০জন শিক্ষক লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত হয়েছে। এসব সংঘর্ষে ও আধিপত্যের লড়াইয়ে ১৮জন নিহত ও প্রায় সাড়ে ৪ হাজার আহত হয়েছে। ছাত্ররাজনীতির এ করালগ্রাসে ধুলিসাত্ হচ্ছে হাজারো বাবা-মার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে ছাত্রসমাজের সম্মান-মর্যাদা আর গৌরবময় ভূমিকা। এ অবস্থা যদি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে, তবে অচিরেই জাতি হারাবে তাদের যোগ্য দক্ষ মেধাবী নেতৃত্বকে আর খুনী, সন্ত্রাসীরা জাতির ঘাড়ে নেতা সেজে বসবে এবং দেশকে বানাবে একটা মৃত্যুপুরী। ছাত্ররাজনীতির বর্তমান এ হালচিত্র দেখে অনেক মেধাবী সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে,তারা এ ধরনের রাজনীতির সাথে নেই। কিন্তু এটা সবাই জানে মেধাবী ছাত্ররা যদি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায় তাহলে ছাত্ররাজনীতি আরো খারাপের দিকে যাবে। কেননা ছাত্ররা এখন থেকেই যদি তাদের মধ্যকার সুপ্ত নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশের সুযোগ না পায় তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই পিছিয়ে পড়ব। ছাত্ররা রাজনীতি করবে কিন্তু ছাত্রদের নিয়ে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়া ঠিক হবে না। ছাত্ররা অব্যশই রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবে, তবে সেটা হবে আদর্শিক, গঠনমূলক এবং ছাত্রকল্যাণধর্মী। তাই আগামী দিনে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে সত্ ও দক্ষ নেতৃত্বের গুণাবলীসম্পন্ন জনশক্তি সৃষ্টিতে সহায়ক আদর্শিক ছাত্ররাজনীতির বিকল্প নেই। eliyas.iu¦hotmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন