শিক্ষা

শিশু শিক্ষায় বৈষম্য কাম্য নয়

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০০
‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’-এ শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে যে সকল বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো বৈষম্যহীন সমাজ সৃষ্টির প্রয়াস এবং শিক্ষালাভের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে দিনদিন বৈষম্য বেড়েই চলছে। রাষ্ট্র সকলের জন্য উন্নত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারছে না। বিত্তবানেরা অর্থের দ্বারা তাদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষা ক্রয় করছে। অথচ নিম্ন আয়ের লোকেরা তাদের সন্তানদের জন্য ভালো মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছেন না। শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বেদনাবহ হয়ে ওঠে। শিশুরা ফুলের মত পবিত্র, নিষ্পাপ। প্রত্যেক শিশুই অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পর্যাপ্ত আদর-যত্ন ও সুশৃঙ্খল নিবিড় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে মানবশিশুর শুভ সম্ভাবনাগুলো বিকশিত হতে পারে। শিশুদের সুস্থ ধারায় লালন বা পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে কোন সমাজ, রাষ্ট্র ও সার্বিকভাবে বিশ্ব সংসারের কল্যাণ। তাই শিশুদের যথাযথভাবে লালন-পালনের দায়িত্ব কেবল সংশ্লিষ্ট পরিবারেই নয় বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও সার্বিকভাবে বিশ্ববাসী সকলেরই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করা জরুরি। শিশুদের যথার্থভাবে লালন-পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা। শিশুর শিক্ষার অধিকার আজ স্বীকৃত একটি মানবাধিকার। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে শিশুর শিক্ষার অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এই সনদের ২৮ এবং ২৯ নং ধারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারা দু’টি যথাযথভাবে অনুশীলন করলে গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর বিশ্বসমাজ। উল্লেখিত সনদের ২৮ নং ধারায় বলা হয়েছে: ‘প্রতিটি শিশুর শিক্ষার অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং বিনা খরচে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা। সব শিশুর জন্য মাধ্যমিক এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষে এ সুযোগ বিনামূল্যে দেয়া যদি সম্ভব না হয়, তাহলে প্রয়োজনবোধে সরকার আর্থিক সাহায্য দেবে।’ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই মানসম্মত নয়। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নত বা যথার্থ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেই। রয়েছে দক্ষ শিক্ষকের অভাব। শিক্ষকতায় দক্ষ হলেও তাদের বেতন-ভাতার বেহাল অবস্থার কারণে তারা শিক্ষা প্রদানে অনেক ক্ষেত্রেই দিতে পারছেন না পর্যাপ্ত মনোযোগ। শিক্ষা উপকরণ এবং আনুষঙ্গিক পরিবেশও অভাব রয়েছে। সরকারি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও অনেকটা ঐরকম। আমাদের দেশে শিক্ষকতা অনেকের নিকট ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগার ব্যাপার হলেও এটি কোন লাভজনক বা উচ্চ সুবিধা ভোগকারী লোভনীয় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সরকারি পর্যায়ে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা এমনকি মর্যাদা প্রদানের দিক থেকে আমাদের দেশ বিশ্বের উন্নত এমনকি উন্নয়নশীল অনেক দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাই ভালো শিক্ষিত ও মেধাবী ব্যক্তিরা আজ অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাচ্ছেন না। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাল অবস্থার সুযোগে এদেশে বেসরকারি উদ্যোগে অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক মানসিকতায় গড়ে উঠেছে নানারকম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্ডার গার্টেন, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন এসব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পড়াতে অনেক বেশি অর্থ যোগান দিতে হয়। স্বল্প আয়ের অভিভাবকদের শিশুরা সেখানে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। সামর্থ্যবানদের সন্তানেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের না পাঠানোর কারণে সামাজিকভাবেও ঐসকল প্রতিষ্ঠান গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। সমাজে অপ্রভাবশালী নিরীহ দরিদ্র শ্রেণির মানুষের সন্তানেরা যেসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে তার মান নিয়ন্ত্রণে সামাজিকভাবে কোন প্রভাব খাটানো সম্ভব হয় না। অন্যদিকে প্রাইভেট কোচিং-এর যে অপকালচার আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে তাতে করে ভালো শিক্ষা নিতে হলে কোচিং নির্ভর হতে হয়। দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের এই সুবিধা দিতে পারেন না। সরকারি সাহায্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দেয়া হলেও কারো কোচিং ফি-এর জন্য তো আর সরকারি অর্থ পাওয়া সম্ভব হয় না। তাই দরিদ্র ঘরের শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষালাভে বঞ্চিত হয়। সরকার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান উন্নত করলে, শিক্ষার পরিবেশ ভালো করলে এবং কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের সাহায্য নিয়েই (কোন প্রকার কোচিং ছাড়া) ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করলে শিশুশিক্ষার বিষয়ে এতটা অভিযোগ আর থাকতো না। লেখক : দর্শনের শিক্ষক চেয়ারম্যান, অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রাকটিক্যাল এথিক্স [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন