‘পল্লিসাহিত্য’প্রবন্ধের শ্রেণিশিক্ষা

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৬:১৯
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রচিত ‘পল্লিসাহিত্য’ প্রবন্ধটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রবন্ধের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন স্কলার্সহোম স্কুল এন্ড কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক রোমানা আফরোজ। লেখক পরিচিতি: ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১০ জুলাই, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশপরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন: ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে বি.এ অনার্স ও ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। তাছাড়া প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে ডিপ্লোমা ও ডি.লিট ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবন: তিনি রাজশাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। সাহিত্যকর্ম: গবেষণা : বাংলা সাহিত্যের কথা, বৌদ্ধ মর্মবাদীর গান। ভাষাতত্ত্ব: ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত। শিশুতোষ গ্রন্থ: শেষ নবীর সন্ধানে, ছোটদের রসুলুল্লাহ, সেকালের রূপকথা। অনুবাদ গ্রন্থ: দীওয়ানে হাফিজ, অমিয় শতক, রুবাইয়াত-ই-ওমর খ্যায়াম। সম্পাদনা গ্রন্থ ও পত্রিকা: বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, আলাওলের ‘পদ্মাবতী’, বিদ্যাপতি শতক, শিশু পত্রিকা— ’আঙুর’। মৃত্যু তারিখ : ১৩ জুলাই, ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। শ্রেণিশিক্ষা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ রচিত বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘পল্লিসাহিত্য’। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কিশোরগঞ্জ জেলায় ‘পূর্ব ময়মন সিংহ সাহিত্য সম্মিলনী’র একাদশ অধিবেশনে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সভাপতিত্ব করেন। এ সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে তিনি যে অভিভাষণ দেন তারই পুনর্লিখিত রূপ এই প্রবন্ধটি। আলোচ্য প্রবন্ধে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বাংলার পল্লিসাহিত্যের বিশেষ কয়েকটি দিক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এ প্রবন্ধে লেখক পল্লিসাহিত্য সংরক্ষণের গুরুত্ব, তাত্পর্য, প্রয়োজনীয়তা এবং পল্লিসাহিত্যের সৌন্দর্যকে চমত্কারভাবে বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। পল্লিসাহিত্য প্রতিটি জাতির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং প্রাচীন সম্পদ। গ্রামের অশিক্ষিত, স্বল্প শিক্ষিত মানুষ মনের তাগিদে এসব সাহিত্য রচনা করে থাকেন। পল্লির নিরক্ষর দরিদ্র, নিপীড়িত জনতার অনাড়ম্বর জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার দৈনন্দিন চিত্র যে সাহিত্যে চিত্রিত হয়, তাই পল্লিসাহিত্য। জনৈক মনীষীর ভাষায়—“ God made the country and man made the town.” বিধাতার সৃষ্ট সেই গ্রাম প্রকৃতির অঢেল সম্পদে ভরা অপরূপ মাধুর্য লীলানিকেতন। শহরের মত চাকচিক্য গ্রামে নেই, কিন্তু গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্যের অপার লীলাক্ষেত্র। পল্লিসাহিত্যে রয়েছে কৃষকের কথা, গৃহস্থের কথা, রাখালের কথা, জেলে-মাঝির কথা, মুটে-মুজুরের কথা। এ সাহিত্যে রয়েছে কোকিলের ডাক, ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া, রূপালি নদীর ঢেউ, শ্যামল শস্যের আন্দোলিত শাখার সৌন্দর্য। কিন্তু এ সাহিত্য তেমন গুরুত্বের সাথে সংগৃহীত হয় নি, এমনকি অনেক সাহিত্য গ্রন্থাকারে বা পুঁথি আকারেও পাওয়া যাচ্ছে না, সংগ্রহ করতে হচ্ছে মানুষের মুখ থেকে। তাই এ সাহিত্য হারিয়ে যাচ্ছে বা রচয়িতার রচনার বাইরে কথকের কথাও ঢুকে যাচ্ছে। অথচ পল্লির এ সাহিত্য ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পল্লির আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এ সাহিত্যের ভান্ডার। কিন্তু সে সাহিত্যভান্ডার সংরক্ষণের কোনো উদ্দ্যোগ নেই। যেহেতু এ সাহিত্যের একটা বিশাল অংশ মানুষের মুখে মুখে সেহেতু কালের বিবর্তনে মানুষ হারিয়ে যাবার সাথে সাথে হারিয়ে যাচ্ছে এ সাহিত্য। এ সাহিত্য যদি গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ না করা হয়, তবে ধীরে ধীরে এই অফুরন্ত ভান্ডার শূন্য হয়ে যাবে। বর্তমান সভ্যতার উন্নত দেশ তথা যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে তাদের গণসাহিত্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে তা এখনো করা হয় নি। তাই আমাদের ঐতিহ্যকে, সংস্কৃতিকে রক্ষা করার জন্য আজ উপযুক্ত গবেষক ও সাহিত্য মনীষীদের উদ্দ্যোগ ও যথার্থ চেষ্টা একান্ত প্রয়োজন। গল্পকার পল্লিসাহিত্যের সৌন্দযের কথা বলতে গিয়ে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ কথা বলেছেন। আমরা নাগরিক সাহিত্যের প্রভাবে পল্লিসাহিত্যের কথা ভুলতে বসেছি কিন্তু এ বড় আক্ষেপের বিষয়। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই বাংলার লোকসাহিত্য সংরক্ষণের ও প্রসারের জন্য বিশেষ গুরুত্বের সাথে পল্লির সাহিত্য আহরণ করা আবশ্যক। মোটকথা, পল্লির মাঠে-ঘাটে, আলো-বাতাসে ছড়িয়ে আছে পল্লিবাংলার অমূল্য সম্পদ। পল্লির প্রতিটি পরতে পরতে যে অফুরন্ত সাহিত্যসম্ভার আজ আমাদের অবহেলায় বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অফুরন্ত সাহিত্যসম্ভারকে ধাপে ধাপে সংরক্ষণ করা এবং এ সাহিত্যের বিলুপ্তি রোধের জন্য উপযুক্ত গবেষকমহল সচেষ্ট হওয়া একান্ত আবশ্যক। পল্লিসাহিত্যের উপাদানগুলো সংরক্ষণ এবং সংগৃহীত হলে আমাদের সাহিত্য সম্পদ আরো সমৃদ্ধ হবে।