এক বছরেরও কম সময় হাতে আছে সরকারের আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার। এ সময়টা বড়ই সংকটাপন্ন। চারদিক থেকে ঘন অন্ধকার চেপে ধরছে আজকের সময়টিকে। এমনটাই হবার কথা। কেননা এর থেকে ভাল কিছুর আশা বা প্রত্যাশার সুযোগ ছিল না বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে। ক্ষমতায় রাজনৈতিক দল এবং প্রধান বিরোধিতায় আর এক রাজনৈতিক দল। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। সুতরাং ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ মনে করে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন করা যাবে না। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রেখে তার অধীনে নির্বাচন করবে না। যেহেতু এই দুটি রাজনৈতিক দলেই রাজনৈতিক নীতির অভাব, তাই কেউ কারও নীতির উপর ভরসা রাখতে পারছে না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হলে বিরোধী দল একটি লেভেল গ্রাউন্ড পেতে পারে যেখানে সরকারি দল বলে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। অন্যদিকে নির্বাচনী কন্ট্রোলকে নিজেদের সুবিধার মধ্যে রাখতে গিয়ে সরকারি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিসর্জন দিতে চাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যেসব খেলা ইতিমধ্যে হয়েছে তা সকলেরই জানা।
তাই আমি সেই ইতিহাস, সেই আদালতের আদেশ এবং সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়গুলো বর্ণনা করে জানা বিষয়কে নতুন করে জানাতে চাই না। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অথবা দলীয় সরকার ব্যবস্থা কোনটাই সংসদে পাস করিয়ে নেওয়ার মধ্যে সমস্যা নেই যদি সেইভাবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এমনকি এ ধরনের একটি আইন পাস করানো আওয়ামী লীগের একার পক্ষেও সম্ভব। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো গোঁ ধরে বসে আছে- কোনভাবেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্যদিকে বিএনপি যে দলীয় সরকার মেনে নেবে না তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। জামায়াতকে ছেড়ে দিলে বিএনপির রাজনীতির মাঠে পেশীশক্তির সুযোগ কমে যাবে, আবার জামায়াতকে না ছাড়লে এক শ্রেণীর ভোটার এবং নিজের দলের লোকজনকে হারাতে হতে পারে। বেগম জিয়া জামায়াত নিয়ে তাই তেমন কোন বাড়াবাড়ি করছেন না, হালকাভাবে পাসে রাখতে চাচ্ছেন। রাজনৈতিক এই দোদুল্যমানতা তাকে জনপ্রিয়তা হ্রাসের মুখে ফেলেছে। খুবই নাজুক একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি জড়িয়ে পড়েছে এবং নাজুক অবস্থা থেকে বের হওয়ার মত সহসা কোন ভাল পয়েন্ট তার হাতে আসছে না। তাই রাজনীতির মাঠ বিএনপি দখল করে রাখতে পারছে না। এমন অবস্থায় বর্তমান সরকারকে নির্বাচন করতে দেওয়া অথবা বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে দলীয় সরকার গঠন করে তার মাধ্যমে নির্বাচন করা কোনটাতেই তার রাজি হওয়ার কথা নয়।
সরকারি দল বেশ একটু সুবিধাজনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। খুব ভাল ফলাফল গত চার বছরে দেখাতে না পারলেও এই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটিকে সামনে নিয়ে এসে অধিকতর মানুষের দৃষ্টি এবং সমর্থন পেয়েছে। সরকার হয়তো বেশি করে ভাবছে নেগেটিভ ভোটের কথা। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে না থাকলেও সরকার, আওয়ামী লীগ, সংখ্যালঘু প্রীতি, ভারতপ্রীতি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক, ইউনূস প্রসঙ্গ ইত্যাদি কারণে সরকারের ভোট কমে যেতে পারে এবং এই নেগেটিভ ভোট কোথাও দেওয়ার নেই বলে বিএনপি পেয়ে যেতে পারে।
সরকারের এই ধারণাটা অমূলক না হলেও বর্তমান পরিস্থিতি অতখানি খারাপ নয় সরকারের জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো সাহস দেখানো। সরকার ঝুঁকি এড়াতেই দলীয় সরকারের কথা বলছে। সব দেখে মনে হচ্ছে, বিষয়টি একটি বন্ধ ঘরে আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সরকার এবং বিরোধী দল অনড়- কেউ কাউকে ছাড় দেবে না। সেক্ষেত্রে সরকার তো বসে থাকতে পারবে না। তাকে নির্বাচন দিতেই হবে। হয় তাকে বিএনপি ছাড়াই নির্বাচন করতে হবে অথবা বিএনপিকে ছাড় দিয়েই নির্বাচন করতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, এখন সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসব সময়ে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দল বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। বিরোধী দলের কাজ হবে তাদের মন:পুত না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা এবং নির্বাচনটি যেন গ্রহণযোগ্য না হয় তার ব্যবস্থা করা। বিএনপি এই দুটি কাজ খুব স্বাভাবিকভাবেই করতে পারবে। খালেদা জিয়ার একক সিদ্ধান্তেই সম্ভব এটি করা। তার আছে হাজার হাজার দুর্ধর্ষ কর্মীবাহিনী। রাজনীতির মাঠে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য তা যথেষ্ট। বাড়তি লাভ আছে তার জামায়াত সমর্থন। হাজার হাজার জামায়াত সশস্ত্র কর্মী প্রাণ দিতেও প্রস্তুত আছে; কেননা বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলার যাবতীয় প্রচেষ্টা তারা করবে। জামায়াতের এমন একটি সমর্থনের আশায় বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দল হিসাবে না মিললেও এখন পর্যন্ত জামায়াতকে নিজের গোষ্ঠীতে ধরে রেখেছেন।
সরকার কি এমনটা জানে না? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে প্রতিদিন সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে গোপন রাজনৈতিক প্রতিবেদন পাচ্ছেন, সেখানে তিনি কি জানেন না? জানেন ঠিকই, তবে বুঝতে চান না সম্ভবতঃ। ক্ষমতায় যাওয়ার পর চারদিকের চাটুকারগিরির দৌরাত্ম্যে তা জানলেও অন্যভাবে বিশ্লেষণ করে ফেলেন। তাই হয়তো মাঝে মাঝে কোন প্রয়োজন ছাড়াই ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন। যাই হোক, যে কথায় ছিলাম; আসন্ন নির্বাচনে সরকার একটি ভুল করলে তার মাশুল দিতে হবে তাকে এবং আওয়ামী লীগকে। গন্ডগোল লাগানোর ব্যাপারে বিএনপি একবারও পিছনে তাকাবে না, কেননা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে যে কোন ঘটনাই তার কাছে বেশি শ্রেয় হবে। গতবারের মতো সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তাও তার জন্য এবার লাভের ব্যাপার হতে পারে এমন চিন্তা তাদের আসতেও পারে। সুতরাং এখন সরকারের হাতে খুব বেশি অপসন খোলা নেই। তাকে হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়েই নির্বাচন দিতে হবে অথবা বিএনপি আসুক বা না আসুক, তাদের ইচ্ছেমত নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে দলীয় সরকারের অধীনে। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার দায়িত্ব পুরোটাই সরকারের। এখানে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সমস্যায় বেশি পড়বে সরকার দলীয় রাজনীতিই। বিএনপি নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করবে, সরকার পুলিশ দিয়ে বিএনপিকে ঠেকানোর চেষ্টা করবে।
মাঝখানে শুরু হয়ে যাবে চরম বিশৃংখলা। রাশিয়ার সাথে যতোই নতুন করে বন্ধুত্বের কথা শুনানো হোক, যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিকভাবে টেক্কা দেওয়ার সুযোগ রাশিয়া বা ভারতের নেই। রাশিয়া থেকে অস্ত্র কেনার ফলে চীন সম্ভবতঃ খুশি থাকবে না বর্তমান সরকারের প্রতি। বিগত দিনে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় বসেছিল সেসময় প্রধান তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করার কর্তৃপক্ষ বা পদ্ধতি কি ছিল তা কি বাংলাদেশের মানুষ আজও জানে? তাই সরকারকে বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখতে হবে। সরকার নতুন করে রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতে পারে, সেই সুযোগ সরকারের হাতে এখনও আছে। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এখনও নির্বাচনের জন্য গুছিয়ে উঠতে পারেনি, এই সুযোগটাই সরকার লুফে নিতে পারে। সরকার আরও একটি বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারে যে, বাংলাদেশের মিডিয়ার অবস্থা বর্তমানে বেশ শক্ত। মিডিয়ার চোখের সামনে নির্বাচনে কারচুপি, ভোট ডাকাতি ইত্যাদি করে কেউ আর এখন পার পেতে পারবে না। সরকারের ভয়ের জায়গাটি তাহলে কোথায়? নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ককে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে শুধু নির্বাচন পরিচালনা করার ক্ষমতা প্রদান করে সংবিধান পরিবর্তন করলেই তো লেঠা চুকে যায়। তাই বলি, সবদিক রক্ষা করুন; নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা নিন।
লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা
