বিশ্বায়ন : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের টিকে থাকা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে বিশ্ববাসীর সামনে এক বিমূর্ত প্রত্যয় (Abstract phenomenon) হিসেবে বিশ্বায়নের ধারণার উদ্ভব, যা আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নিরন্তর ধ্বনিত শব্দে পরিণত হয়েছে। মূলত স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) অবসানের পর বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শোষণে নিয়তেই এই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সৃষ্টি। আজ আমরা যাকে বিশ্বায়ন (Globalization) বলি, এই প্রক্রিয়াটি ১৯৪৭ সালেই হবার কথা ছিল। কিন্তু তখন বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান বিশ্ববাণিজ্য ও শুল্কবাধা নির্দিষ্ট না হবার কারণে WTO (World Trade Organization)-এর পরিবর্তে GATT (General Agreement on Tarffs and Trade) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উল্লেখ্য, আজ একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়নের দায়িত্ব WTO'র হাতে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা ও ইইউ (Europio Union)-এর সামনে কোন বাধা না থাকায় এপ্রিল ১৯৯৪ মরক্কোর মারাকাসে WTO চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং চুক্তির শর্ত মোতাবেক ১ জানুয়ারি ১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে WTO যাত্রা শুরু করে। বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য কার্যকর করার পূর্বশর্ত হিসেবে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক তুলে দিতে WTO ১৯৯৫ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই দশ বছর সময় প্রদান করে। কারণ এই সময়ে WTO সদস্য রাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রীরা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য একটি বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এ লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে সিংগাপুরে, ১৯৯৮ সালে জেনেভায়, ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটোলে এবং ২০০১ সালে কাতারের রাজধানী দোহায় চতুর্থ বাণিজ্যমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দোহা রাউন্ডে কৃষি ও অকৃষি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম সম্মেলনের চুক্তির বাস্তবয়ন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ (EU) চায় শিল্প চুক্তি এবং অন্যদিকে ভারত, ব্রাজিল ও বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশ চায় কৃষি চুক্তি। এই দুই পক্ষ এখনও যার যার অবস্থানে থাকায় দোহা রাউন্ডের পরবর্তী সম্মেলনগুলো অনেকটা সিন্ধান্তহীনভাবেই ইতি টানে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের দিকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অগ্রসর হয়। যেমন- ২০০৮ সালে BRIC গঠিত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সাথে বাণিজ্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ইইউ (EU) দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার সাথে বাণিজ্য করার জন্য অগ্রসরমান; জাপান, থাইল্যান্ড ও সিংগাপুরের বাণিজ্য চুক্তি ইতিমধ্যে প্রক্রিয়াধীন। এমতাবস্থায় আমরা যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের কোন অর্থনৈতিক কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত ছিল না। ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিকে জাতীয়কণ করেন। এই জাতীয়করণ (Nationalization) প্রক্রিয়া সফল হতে না হতেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুরু হয় বিরাষ্ট্রীয়করণ (Privatization) প্রক্রিয়া। আবার বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া সফল হতে না হতেই ১৯৯১ সালে বিশ্বায়নের কারণে বাংলাদেশ গ্রহণ করে মুক্তবাজার অর্থনীতি (Free Market Economy)। এ কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেছে বিশ্বায়নের কারণেই। উল্লেখ্য যে, বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবার পূর্বে যে কোন জাতি বিদেশি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কবাধা আরোপ করতে পারত। তখন এই শুল্কবাধাই ছিল একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতির রক্ষাকবচ (Amulet)। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো এই জাতীয় অর্থনীতির রক্ষাকবচকে ব্যবহার করে শিল্পের বিকাশ সাধন না করেই মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করেছে। যার ফলস্বরূপ আজ বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কঠোর প্রতিযোগিতার সম্মুখীত হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য যেসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তাহলো-বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, বাণিজ্য ঘাটতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন রুগ্ন না হয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে (আদমজী জুটমিল, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল), বেকার সমস্যা বেড়েই চলছে। এ সমস্যা থেকে দেশকে উত্তরণের জন্য দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো উচিত এবং দেশের অর্থনীতি বিকাশের স্বার্থে পররাষ্ট্রনীতির প্রবণতা হিসেবে অর্থনৈতিক কূটনীতির (Economic Diplomacy) সর্বোত্তম ব্যবহার করা উচিত বলে আমি মনে করি। এছাড়াও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি আদায়ে সরকারের কার্যকরী কূটনৈতিক (Diplomatic) উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত, যা আমাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিকাশে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। লেখক:এমএসএস (সমাজ বিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়