বাংলাদেশের কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ বিষয়ক সমস্যা নতুন নয়। কিন্তু আজকাল বিষয়টি সর্বমহলে ভীষণ জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। কারণ, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রৌদ্র-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে, ধার-দেনা করে পণ্য উত্পাদন করে কৃষক। কিন্তু ন্যায্যমূল্য থেকে সে হয় বঞ্চিত। ভোক্তা অবশ্য চড়া দাম দেয়। সিংহভাগ কৃষিপণ্যের বাজারদর চলতি সময়ের শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের নাগালের বাইরে। প্রতি কেজি টমেটোর দাম ৮০ টাকা। কোন সবজিই ৪০ টাকার নিচে কেজিপ্রতি বিক্রয় হয় না। কিন্তু বাস্তবিক অর্থেই কৃষক উল্লেখিত দামের চার ভাগের এক ভাগও পায় না। এক্ষেত্রে সমস্যা গতানুগতিক। সমস্যা সকলেরই জানা। সমস্যাগুলো হলো মধ্যস্বত্বভোগী এবং চাঁদাবাজদের ভূমিকা। চলমান প্রবন্ধে আমরা উল্লেখিত সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবনা প্রকাশের চেষ্টা করবো। এখানে আমরা চারটি বিষয় বিবেচনায় নিতে পারিঃ (১) মাঠ পর্যায়ে কৃষক কর্তৃক কৃষিপণ্য বিক্রির অর্থনৈতিক পরিবেশ, (২) কৃষিপণ্য শহরের পাইকারী বাজারে পৌঁছানো, (৩) পাইকারী বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি এবং (৪) ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রির অর্থনৈতিক পরিবেশ। বর্তমানে কৃষক উত্পাদিত পণ্য মাঠ পর্যায়ে আড়তদার কিংবা মহাজনের কাছে বিক্রি করছে। এক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে চাষীদের কৃষিপণ্য বিক্রি সমবায় সমিতির মাধ্যমে করা প্রয়োজন। এবং এই সমিতির ব্যবস্থাপনায় পণ্য পাইকারী বাজারে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা ফলদায়ক হবে। এক্ষেত্রে আইন- শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর নিজেদের চাঁদাবাজি থেকে দূরে থাকা প্রয়োজন এবং সাথে সাথে সমাজশক্তির অন্য কোন অংশ যেন চাঁদাবাজি না করতে পারে সে বিষয়ে কার্যকরী ভূমিকা পালন করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে রাজধানীতে বিদ্যমান পাইকারী বাজার বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। রাজধানী ঢাকায় ওয়ার্ড ভিত্তিক কৃষি পণ্যের পাইকারী বাজার প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। তাহলে পাইকারী বাজার ব্যবস্থা যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। পাইকারী বাজারের দাম ও মাঠ পর্যায়ের দামের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক নির্ধারিত দাম প্রযোজ্য হতে পারে। চূড়ান্ত পর্যায়ে বা ভোক্তার ক্রয় পর্যায়েও খুচরা বিক্রেতার জন্যে দাম নির্ধারিত থাকা অত্যাবশক। কারণ অহরহ দেখা যাচ্ছে যে, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বাজারভেদে বিভিন্ন রকম। এক কথায় উত্পাদনকারীর মাঠ পর্যায়ে বিক্রি থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত কার্যকরী উত্পাদক-ভোক্তা বান্ধব কার্যকরী সমবায় পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে ভাল হয়। এক্ষেত্রে সমবায়ী উদ্দেশ্যকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ও পাইকারী পর্যায়ে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখার জন্যে সংরক্ষণাগার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সব কাঠামোগত সুবিধা দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। একইভাবে দেশের সমস্ত বিভাগীয় শহরগুলোতেও সমবায়ী কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা জনস্বার্থে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের সমস্যার বিষয়টি জাতীয় অর্থনীতির এক বিশাল অংশ জুড়ে আছে। একদিকে দেশের শতকরা ৮৫ভাগ জনসাধারণ যারা গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অপরদিকে কৃষিপণ্যের বিশাল ভোক্তা শ্রেণী । উত্পাদক শ্রেণী ন্যায্যমূল্য না পেলে যেমন হারাবে উত্পাদন-উত্সাহ তেমনি ভোক্তা শ্রেণী চড়া মূল্য দিতে গিয়ে হয় দিশেহারা। সাথে সাথে একথাও সকলকে স্মরণে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষিপণ্যের বাজার দখলে রেখে উত্পাদক ও ভোক্তা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষায় বাধার সৃষ্টি করবে। তাও কোন বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
লেখক: চেয়ারম্যান, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,
বনানী, ঢাকা
