চলতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যে ঘুরে দাঁড়াবে তার পেছনে অনেক ভালো যুক্তি আছে। পাঁচ বছর আগে দেশটির অর্থনীতিতে যে মন্দা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তা গত তিনবছর ধরে একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে। এখনো যে এক কোটি ২০ লাখ লোক বেকার আছেন তারা হয়তো মনে করছেন, এখনো মার্কিন অর্থনীতিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। যাদের আয় কমে গেছে এবং যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি কিনেছেন তারাও এ ধারণার সাথে যুক্ত হয়েছেন। তবে সার্বিক বিচারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যে মন্দা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে তার পেছনে যথেষ্ঠ যুক্তি আছে।
সাম্প্রতিককালে মার্কিন সরকারের কাছ থেকে অর্থনীতির যে তথ্য উপাত্ত আসছে তা এক কথায় মন ভালো করিয়ে দেয়ার মতো। ২০১০ সালের পর অর্থনীতিতে দুই দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। অতীতের বিচারে এ হারে প্রবৃদ্ধি অনেকটা আশা জাগানিয়া। কিন্তু এ হারে প্রবৃদ্ধির পরও বেকারদের সংখ্যার দিকে তাকালে অনেকের চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠছে। অনেক অর্থনীতিবিদ বলে থাকেন, উত্পাদনই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল শক্তি। এটি বিচার করলে দেখা যায় দেশটির উত্পাদনের যে ক্ষমতা আর যে পরিমাণ উত্পাদন তাতে এক ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি আছে। এটাকেই মন্দা কাটিয়ে উঠার ব্যারোমিটার হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এ এক ট্রিলিয়ন ডলারের উত্পাদন বাড়লে বেকারত্ব তো থাকবেই না, বরং প্রবৃদ্ধিকে তা নিয়ে যাবে উচ্চ মাত্রায়।
আবাসন খাত: গত কয়েকবছরে আবাসন খাতের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, এ খাতটিতে এক চরম মন্দা বিরাজ করছে। বিশেষ করে এ সময়ে অবিক্রিত বাড়ির সংখ্যা গত ৬ বছরের মধ্যে অত্যন্ত কম। তবে, বাড়ি অবিক্রিত থাকার পেছনে যুক্তিও আছে। এসময়ে অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। জনসংখ্যা বিবেচনায় যে হারে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছিলো তার চেয়ে বেশি নির্মাণের ফলে অনেক বাড়ি অবিক্রিত থেকেছে। গত নভেম্বর মাসেই যুক্তরাষেষ্ট্র মোট বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে আট লাখ ৬১ হাজার। এ সংখ্যা দুবছেরর আগের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বেশি। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, যে পরিমাণ বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে তার সংখ্যাও কম। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যান ব্যুরো আগামী কয়েকবছরের যে তথ্য উপাত্ত দিয়েছে তাতে বছরে ১২ লাখ বাড়ির চাহিদা আছে বলে বলা হয়। সে হিসেব বিবেচনায় এবছর যদি ১২ লাখ বাড়ি তৈরি হয় তাহলে সেখানে অনেক লোকের চাকরি হবে।
তবে একটি বিষয় নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে। যে পরিমাণ বাড়ি নির্মাণ হয়েছে এবং তাতে যে সংখ্যক চাকরির সুযোগ হবার কথা ছিলো বাস্তবে তা হয়নি। চাহিদা এবং প্রকৃত কর্মক্ষেত্রে নিযুক্ত সংখ্যার মধ্যে পাঁচ হাজারের ব্যবধান রয়েছে বলে জানা গেছে। এক হিসেবে দেখা যায় নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের বেকারের হার প্রায় ১৩ শতাংশ। এর পরেও ৫ হাজার শ্রমিকের চাকরি না হওয়ার পেছনে যুক্তি হচ্ছে, অনেক চাকরিদাতা তাদের কাজের দ্রুততা কমিয়ে দিয়েছেন। চলতি বছর যদি এসব শ্রমিক চাকরিতে ফিরে তাহলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্যক্তিখাতে ঋণ: প্রতিটি আমেরকািন যে বিষয়টি নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকেন তা হলো ব্যক্তিখাতের ঋণ। অর্থনীতিতে যখন সুবাতাস ছিলো তখন সবাই ব্যক্তিখাতের ঋণ নিতে তেমন অসুবিধা বোধ করেননি। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে তাদের ঘুম ছুটে গেছে। ক্রেডিট কার্ড বিল, শিক্ষা ঋণ এবং আবাসিক ঋণের ভারে অনেকে জর্জরিত। অনেকে মনে করছেন, আমেরিকানরা কখনোই বেশি বেশি খরছ করবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদেরকে এসব ঋণ থেকে মুক্ত করা না হয়। তবে এক্ষত্রে একটি সুখবর আছে, তা হলো এখন তারা তাদের ঋণের কিস্তি দিয়ে কিছু টাকা বাঁচাতে পারবেন। ফেডারেল রিজার্ভ ইতিমধ্যে সুদের হার কমিয়ে আনার জন্য নীতি ঘোষণা করেছে। এছাড়া যারা ঋণ শোধ করতে পারছেন না তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আসার কথা শোনা যাচ্ছে। মনে করা হচ্ছে ফেডারেল রিজার্ভ যে নীতি ঘোষণা করেছে তাতে ঋণগ্রহীতাদের সুদের হার অনেক কমে আসবে। অনেকে নতুন বাড়ি কিনতে উদ্বুদ্ধ হবেন। আর ফেডারেল রিজার্ভ ক্রেডিট কার্ড এবং গাড়ী কেনা খাতে ঋণ প্রদানে যে সুদের হার কমিয়েছে তাও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।
কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার: কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশেষ করে বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে এ দুটির সমন্বয় না থাকলে অর্থনীতি পিছিয়ে পড়বে বলে মনে করছে ওবামা প্রশাসন। এর আগে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সরকার কিছু কিছু জায়গায় ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু সামনের দিনগুলোতে ওবামা প্রশাসন স্থানীয় সরকারের সাথে মিলেমিশে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্দা মোকাবেলার কৌশল গ্রহণ করছে। এতে, কোন রাজ্যে কি ব্যবস্থা নিতে হবে তা সুষ্ঠুভাবে উঠে আসবে। ২০০২ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিবছর স্থানীয় সরকার গড়ে দুই লাখ ২৬ হাজার চাকরি সৃষ্টি করতে পেরেছে। এসময়ে গড়ে প্রতিবছর এক লাখ ৫৪ হাজার লোক বিভিন্ন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এ কারণে রাজ্যগুলোকে তাদের বাজেট মেলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে নিতে তাদের বেগ পেতে হয়েছে। ওবামা প্রশাসন এখন প্রতিটি রাজ্যের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। কোথায় কি লাগছে তার সুষ্ঠু হিসাব করা হচ্ছে। পরবর্তী ছয়মাসে গড়ে প্রতিমাসে ৪৮ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টির কথা বলেছেন ওবামা। সে হিসেবে যদি চাকরির বাজার এগিয়ে যায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সুবাতাস আসতে আর বেশি দেরী নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আশা জাগানিয়া খবর জানুয়ারিতেই: গেল জানুয়ারি মাস ওবামা প্রশাসনের জন্য খুবই ভালো সময় গেছে। এসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মোট এক লাখ ৫৭ হাজার নতুন চাকরির যোগান দিয়েছে। এছাড়া গত নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসে সোয়া লাখ চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো। এর ফলে দেশটির বেকারত্বের হার সাত দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে সাত দশমিক আট শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী যেসব খাতে এ চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার মধ্যে ছিলো-খুচরা বিক্রি, নির্মাণ খাত, স্বাস্থ্যসেবা। তবে পরিবহন এবং ওয়্যারহাউস খাতে চাকরি এসময় কমেছে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষ করে এ দুটি খাতে অটোমেশন হয়ে যাওয়ায় চাকরির সুযোগ কমেছে বলে জানা গেছে। শুধুমাত্র স্বাস্থ্যখাতে জানুয়ারি মাসে মোট ২৩ হাজার চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
