ভারতে জমির দাম নাটকীয়ভাবে বাড়ছে। এর ফলে সেখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব। এ সমস্যাটি ইদানিং বেশি প্রকট আকার ধারণ করেছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশদের বেলায়। কারণ তারা দীর্ঘদিন জন্মভিটা থেকে দূরে পড়ে থাকায় এ সুযোগে অনেক আত্মীয়-স্বজন এসব জায়গা বেদখল করে দিব্যি ভোগ করে যাচ্ছে। কিন্তু জমির মূল মালিকরা যখন দেশে ফিরে এসে তা বিক্রি করতে চাচ্ছে তখনই বের হয়ে আসছে আসল সত্য। একপর্যায়ে তাদেরকে জমি ফেরত পেতে দৌড়াতে হচ্ছে আদালত পর্যন্ত। এতে করে তারা ক্রমশ দিনে দিনে জড়িয়ে পড়ছে আইনি জটিলতায়। সেইসঙ্গে তাদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে বসতভিটা হারানোর ভয়। এখন তাদের সেই আতঙ্কেই দিন কাটাতে হচ্ছে। তেমনই একজন হচ্ছেন ইকবাল সিং।
মি. সিং লন্ডনের ওলভারহ্যাম্পটন শহরে থাকেন। অনেকটা উত্তরাধিকারী সূত্রেই তিনি পেয়েছেন জমির এই ঝক্কি-ঝামেলা। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলছে তাদের ভূমি নিয়ে মামলা। ভারতের পাঞ্জাবে প্রত্যন্ত একটি এলাকায় রয়েছে তাদের কিছু কৃষি জমি। সিংয়ের বাবা যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পাওয়ায় সেইসূত্র ধরে তিনিও সেদেশের বৈধ অভিবাসীর মর্যাদা পান। এরপর থেকেই ইকবাল সিং সেখানে বসবাস করে আসছেন। সম্প্রতি তিনি দেশে এসেছেন তাদের পৈত্রিক সম্পত্তির মামলা নিষ্পত্তি করতে । ১৯৬০ সালে তার বাবা পাঞ্জাবের অনেক লোকের মতো এখানে আসেন বসবাসের উদ্দেশ্যে। একসময় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তার পিতাকে সংসার চালাতে হতো। অভাবের সংসারে তাদের স্বপ্ন ছিল একদিন স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে। ইকবাল সিং বলেন, একসময়ে আমাদের বিনোদনের জন্য একটা টেলিভিশন পর্যন্ত ছিল না। আমরা তখন ছিলাম বেশ দরিদ্র। এই অভাবের তাড়নাই ধারদেনা করে আমার বাবা পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর যুক্তরাজ্যে। আর তার নাগরিকত্ব পাওয়ার সুবাধে আমরাও পেয়ে যাই থাকার অনুমতি। তিনি বলেন, আমার পিতা তার আয়ের সামান্য সঞ্চয় থাকলেও তা জমি কেনার জন্য রেখে দিতেন। একসময় আস্তে আস্তে করে তিনি কিছু জমি কেনেন। আমার বাবার স্বপ্ন, একসময় তিনি দেশে ফিরে এসে শেষ বয়সটা নিজের বসতভিটায় কাটাবেন। আমার বাবা বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে ২০ একর জমি কিনেছেন ৪৭ হাজার ডলারে। এটা ভারতের একটা ভালো কৃষি এলাকা বলে পরিচিত। বর্তমানে এর দাম প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন এই জমি নিয়ে মামলা চলছে বলে আমরা তা বিক্রি করতে পারছি না। ইকবাল সিং বলেন, আমাদের ওই কৃষি জমি দেখাশুনার জন্য একজন আত্মীয়কে রাখা হয়েছিল। যখন আমরা দেশে ফিরে আসি তখন দেখি পিলে কাঁপানোর মতো একটা বিষয়। আমাদের জমি অন্য কেউ দাবি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই জমি প্রতারণার মাধ্যমে আমারই দাদা অন্যত্র বিক্রি করে দেন। অথচ এটা ছিল আমার বাবার খরিদসূত্রে কেনা জমি। এছাড়া আমার দাদার সঙ্গে আমাদের পরিবারের কোন সম্পর্কও ছিল না। দীর্ঘদিন বিভূঁইয়ে থাকার কারণে এ সুযোগটা নিয়েছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে ইকবাল পরিবার এই জমির জন্য আইনি লড়াই শুরু করেন। এরপর থেকে শুধু আইনি লড়াই, উকিলের অনেক যুক্তিতর্ক কিন্তু তারপরেও কিছুতেই কিছু হয়নি।
ইকবাল সিংয়ের মতো অনেককেই এখন পাঞ্জাবে তাদের জমিজমা নিয়ে মামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এটা এখন যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী অনেক পাঞ্জাব নাগরিকের জন্য একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারজাপ সিং নামে লন্ডনের এক ভারতীয় আইনজীবী বলেন, এটা একটা কঠিন মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতা। এ ধরনের ঘটনা যে হারে বেড়ে চলেছে তাতে এখানে বসবাসকারী অনেকেরই ঘুম হারাম হয়ে গেছে। জীবনের তিল তিল করে জমানো অর্থ দিয়ে সম্পদ করে তা যদি অন্যের হয়ে যায়, তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু থাকতে পারে না। তিনি বলেন, এ ঘটনা আমাদের সমাজে নতুন তা কিছু নয়। এটা ঘটে যাচ্ছে হরহামেশা। তবে এর মোকাবিলায় যদি আমরা সবাই সচেতন না হই তাহলে এর ফলাফল হবে ভয়াবহ। হারজাপ সিং যুক্তরাজ্যের যে জায়গায় বসবাস করেন তার নাম সাউথফল। এই জায়গাটি সেখানে ক্ষুদ্র পাঞ্জাব নামে পরিচিত। বেশিরভাগ ভারতীয় এখানে এসে বসবাস করে। হারজাপ সিং আরো বলেন, ইদানিং ব্রিটেনে থাকা অনেক ভারতীয়কে তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে দেখা গেছে। তিনি বলেন, এর পিছনে অবশ্য একটা কারণও রয়েছে। তাহলো অবৈধভাবে ভোগ দখল করে আসা অনেকেই দাবি করছেন, যারা বিদেশ গিয়েছেন তারা একসময় তাদের কাছ থেকে ধারদেনা করে সেখানে গিয়েছেন। এ কারণে তারা সম্পত্তির দখল ছাড়তে রাজি নন। আর বিদেশে যারা রয়েছেন তারাও জমির দাম হু হু করে বাড়ায় এখন গ্রামমুখী হয়ে উঠছেন। ফলে মাঝখানে পড়ে গেছে দীর্ঘদিনের অবৈধ ভোগ দখলকারীরা। এছাড়া বিগত এক দশকে দ্রুত নগরায়নও এই জমির দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তাই তারা বেশি অর্থের আশায় বিক্রির দিকে ঝুঁকছেন।
