ইমেলদার সম্পদ কোথায়

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:৫৫
ইমেলদা মারকোস নামটির প্রতিশব্দ বিপুল ধনসম্পদ, প্রচন্ড লোভ ও অতিরিক্ত সবকিছু। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার স্বামী ফার্দিনান্দ মারকোসের ২০ বছরের শাসনামলে তিনি গড়ে তুলেন আর্ট, জুয়েলারি এবং সম্পদের বিশাল ভান্ডার। তবে তিন হাজারেরও বেশি দামি জুতা সংগ্রহ করে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন ইমেলদা। ১৯৮৬ সালে জনরোষে যখন রাজদম্পতি রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে আমেরিকার হাওয়াইতে পারি জমান তখন ইমেলদা ফেলে যান এক হাজার দুইশ ২২ জোড়া জুতা। ভ্যানগগ, পল ক্যাজানে, র্যামব্রান্ট, রাফায়েল এবং মাইকেল অ্যাঞ্জোলোর পেইন্টিংয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ, আমেরিকা ও ফিলিপাইনে বিলাসবহুল প্রাসাদ, টেবিলের কাপড়ে রূপার কারুকার্যময় কাজ, সোনার নেকলেস এবং ডায়মন্ডের মুকুটের একটি সংগ্রহশালা আছে তার। পশ্চিমা মিডিয়া তাকে বলে আয়রন বাটারফ্লাই। ফার্দিনান্দ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরবর্তী কোরাজন অ্যাকুইনো সরকার তার সম্পদ উদ্ধারে একটি কমিশন গঠন করে। কমিশন হিসাব করে দেখতে পায় তাদের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের। এই ২৬ বছরেরও বেশি সময়ে মাত্র চার বিলিয়ন ডলারের সম্পদের হিসাব পাওয়া গেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে বাকি ধন সম্পদ কোথায়? এই পুরাতন ইস্যুটি অনেকেই ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে ইমেলদা মারকোসের সাবেক ভৃত্য ভিলমা বতিস্তাকে ক্লড মনেটের জলপদ্ম সিরিজের একটি পেইন্টিং অবৈধভাবে বিক্রির দায়ে যখন নিউইয়র্কের একটি আদালতের সামনে হাজির করা হয় তখন বিষয়টি ফের সামনে চলে আসে। ওই ছবিটির দাম উঠেছিল ৩২ মিলিয়ন ডলার। ইমেলদা ও ফাদিনান্দ মারকোস প্রাসাদ ছেড়ে পালানোর সময় বতিস্তা বেশ কয়েকটি মাস্টারপিস ছবি চুরি করে নিজের কাছে রেখে দেন। তিনি স্বীকার করেছেন ওই ছবিটি ছাড়াও তার কাছে আরো তিনটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম আছে। কমিশন স্বীকার করেছে একদা মার্কোসের অধীনে থাকা বর্তমানে নিখোঁজ ১৪৬টি পেইন্টিংয়ের মধ্যে এই চারটি অন্যতম, যার খোঁজ তারা বের করতে পারেনি। আশ্চর্যজনক কিছু নয়, সম্ভবত ইমেলদার বিশাল সংগ্রহশালার মধ্যে তার জুতাগুলোই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। আমেরিকা পালানোর সময় তাদের বিলাসবহুল প্রাসাদে সারি সারি তাকে হাজার জোড়া জুতা ও পৃথিবীখ্যাত শিল্পিদের ছবি পাওয়া গিয়েছিল। যা তাদের ভোগবাদী জীবনের চিহ্ন রেখে গেছে। এই জুতাগুলোর কিছু ম্যানিলার উত্তরে জুতা শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ মালিকানার একটি বিশেষ জাদুঘরে স্থান পাচ্ছে। কিছু জুতা এবং উত্সবে পরার কিছু পোশাক শোভা পাচ্ছে ফিলিপাইনের জাতীয় জাদুঘরে। গত সেপ্টেম্বরে যখন জানা গেলো উইপোকা জাদুঘরের অধিকাংশ সংগ্রহ খেয়ে ফেলছে তখন চারদিকে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। কমিশন নিউইয়র্কে ইমোলদার ভূসম্পত্তি ও মিলিয়ন ডলার মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছে। সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। সুইস সেন্ট্রাল ব্যাংকের একটি ভল্টে রুবি ও ডায়মন্ডের একটি মুকুট পেয়েছে, যার সম্ভাব্য মূল্য হতে পারে আট মিলিয়ন ডলার। সম্পত্তি উদ্ধারে গঠিত কমিশনের প্রধান আন্দে জ বতিস্তা স্বীকার করেন, এখনও ইমোলদার অনেক সম্পদই পাওয়া যায়নি-বিশেষ করে মূল্যবান পেইন্টিংগুলো। এগুলো উদ্ধারে তারা একটি তালিকা করেন। এতে দেখা যায় ইমেলদার কাছে পৃথিবীখ্যাত ৩০০টিরও বেশি মাস্টারপিস ছিল। এর মধ্যে ১৪৬টিরও বেশির এখন পর্যন্ত কোন হদিস পাওয়া যায়নি। অর্থ দিয়ে এগুলোর মূল্য বিচার করা যাবে না। আমরা জানি না ওই মাস্টারপিসগুলো এখন কোথায়। ওগুলো যে কোন জায়গাই থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে বতিস্তা আরো বলেন, ধারণা করা হচ্ছে ওই ছবিগুলো এখনও ইমেলদার কাছে থাকতে পারে। ইমেলদা মারকোসের আইনজীবী রবার্ট সিসন বলেন, মারকোস পরিবারের বিরুদ্ধে এমন অনেক অভিযোগ আনা হয়েছে, যার কোনটিতেই তাদের পুরোপুরি অভিযুক্ত করা যায়নি। কমিশনের সাফল্য সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের ২০০৩ সালের একটি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে আন্দ্রেজ বতিস্তা বলেন, সর্বোচ্চ আদালত অসদুপায়ে অর্জিত ইমেলদার তিন লাখ ২০ হাজার ডলার পেয়েছে। আমরা সম্পদ উদ্ধার কাজের জন্য শপথ নিয়েছিলাম এবং তা করে চলেছি। এতোকিছুর পরেও ইমেলদা নিজে এবং তার ছেলে ও মেয়ে ফিলিপাইনের রাজনীতিতে সক্রিয়। কমিশনকে দেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। ছবিগুলো খুঁজে না পাওয়ার জন্য নয়, এই কমিশন সম্পর্কে ফিলিপিনোদের মধ্যেই শ্রদ্ধার অভাব রয়েছে। কমিশনের সাবেক একজন সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বতিস্তা এ ব্যাপারে দেশের জনগণের সমর্থন চেয়েছেন। ফিলিপাইনের বিচার ব্যবস্থার কাজ চলে অত্যন্ত শ্লথ গতিতে। ইমেলদা ও তার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হলেও বিভিন্ন উপায়ে সেখান থেকে তারা অব্যাহতি পেয়ে যান। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে কমিশনকে ফিলিপাইনে এ পরিবারটির ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে। নির্বাসিত জীবন থেকে ১৯৯১ সালে দেশে ফেরেন ইমেলদা। তার দু’ বছর আগে তার স্বামী যুক্তরাষ্ট্রেই মারা যান। ২০১০ সালে নোথ প্রদেশ থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন ইমেলদা। তার মেয়ে ইমি একটি প্রদেশের গভর্নর। তার ছেলে সিনেট সদস্য। যার ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইমেলদা বলেছিলেন, ফিলিপাইনের কংগ্রেসে একটা বিশেষ ভূমিকা রাখাই তার মূল উদ্দেশ্য। এটা হবে সৌন্দর্য এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ফিলিপাইনকে বাঁচাতে চান, রক্ষা করতে চান পুরো পৃথিবীকে অন্তহীন নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়। ফিলিপিনোরা তখন ইমেলদার জুতা, অলঙ্কার আর বিভিন্ন বিলাস সামগ্রীর পেছনে অপব্যয়ের কথা বলেন। ইমেলদার দাবি, তিনি ওসব জিনিস নিজের পয়সায় কিনেছেন। রাষ্ট্রের একটি পয়সাও এর পেছনে ব্যয় করা হয়নি। মারকোস পরিবারের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনে ও যুক্তরাষ্ট্রে ৯০০টিরও বেশি মামলা হলেও ইমেলদার ছেলে ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন, কোনো ব্যাপারে মার্কোস পরিবারের লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। তার নামের সঙ্গে স্বৈরশাসক বাবার নামের মিল থাকাকে লজ্জাজনক বলে মনে করেন না। বরং তিনি মনে করেন, রাজনীতির ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে এটা তার জন্য বড় সুযোগ এনে দেবে। ক্ষমতাশালীদের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অনেক নজির আছে ফিলিপাইনে। সাবেক প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া আরোইয়ার বিরুদ্ধে অসদুপায়ে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে বর্তমানে মামলা চলছে। নতুন নতুন দুর্নীতির ঘটনায় চাপা পড়ে যায় পুরাতন ঘটনা, এক সময় সেগুলো মানুষ ভুলেও যায়। আন্দ্রেজ বতিস্তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, মাস্টারপিসগুলো ও ব্যাংক হিসাব আর পাবেন কিনা তিনি দুর্বল হাসি দিয়ে বলেন, চেষ্টা করছি। ইমেলদার বয়স এখন ৮৩ বছর। এখনও তিনি আগের মতো শক্তিশালী ও প্রাণোচ্ছল। মূল্যবান জিনিস সংগ্রহ করার নেশা তার আগের মতোই আছে। বিবিসির এক প্রতিবেদক বলেন, কয়েকবছর আগে ইমেলদার একটি সাক্ষাত্কার নেয়ার পর তার সঙ্গে একটি ছবি তুলতে চাই আমি। সবচেয়ে কাছের একটি পেইন্টিংয়ের সামনে আমরা ছবি তোলার জন্য দাঁড়ালাম। ছবিটি দেখিয়ে বলি এটা পিকাসোর কিনা। তিনি বেশ গর্ব সহকারেই জবাব দিলেন, হ্যাঁ। ১৯৬৫ সালে ফিলিপাইনের ক্ষমতায় এসেছিলেন ফার্দিনান্দ মার্কোস। পুরো সময়টাতেই সামরিক শাসন জারি করে দেশ পরিচালনা করেন তিনি। এই সময়টাতে মারকোস পরিবার বিলাসবহুল জীবনের জন্য বিশ্ব মিডিয়ার নজরের কেন্দ বিন্দুতে ছিল। ক্ষমতায় না থাকলে কি হবে, ক্ষমতায় থাকার সময় আয়ত্ত অভ্যাসের রেশ এখনও রয়ে গেছে ইমেলদার মধ্যে। এখনও তার সাজগোজের শেষ নেই। সেই ফাঁপানো চুল, চোখের পাতায় নীল আইশেড, আর কোটের নিচে শোল্ডার প্যাডঅলা ইমেলদাকে দেখে কারও মনে হয় না যে, ১৯৮৬ সালে এই সাধের জিনিসপত্র ফেলে তাকে পালাতে হয়েছিল।