একসময় পৃথিবীতে দেশ দখল করার জন্য সম্রাটরা যুদ্ধে লিপ্ত থাকতেন। স্থল যুদ্ধ ছিল দেশ দখলের প্রধান হাতিয়ার। পরে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো নৌপথ করায়ত্তের চেষ্টা চালায়, যেটি এখনো চলছে। তবে এই অত্যাধুনিক যুগে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো স্থলভাগ এবং জলভাগ ছাড়িয়ে পাড়ি দিচ্ছে আকাশপথে। দেশগুলো মহাকাশে তাদের শক্তি প্রদর্শনে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, হয়তো এক সময় মহাকাশ দখলের লড়াই তথা তারকা যুদ্ধ হবে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে। এক সময় মহাকাশের স্বপ্ন রাশিয়া (সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) এবং যুক্তরাষ্ট্র দেখলেও এখন বৃহত্তম মহাদেশ এশিয়ায় অনেক দেশই মহাকাশভিত্তিক নানা স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রসর হচ্ছে। সমপ্রতি দক্ষিণ কোরিয়া একটি রকেট সফলভাবে উেক্ষপণ করায় এ বিষয়টি মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করছে। উন্নত দেশগুলো এখন আর মহাকাশ গবেষণাকে অর্থ ব্যয় হিসেবে দেখছে না বরং তারা একে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবেই দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া মহাকাশ দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও একবিংশ শতব্দীতে এশিয়া বিশেষ করে উত্তর এশিয়া এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের উপ-পরিকল্প পরিচালক ড্যানিয়েল পিঙ্কস্টন বলেন, সেই অবস্থায় পৌঁছে গেছি আমরা।
চীন এক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর। আছে জাপান এবং উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক আবহাওয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বছরের শেষ দিকে এই প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি চাঁদে ভ্রমণযান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে চীন। দেশটি ২০১২ সালে প্রথমে পুরুষ এবং পরে মহিলা পাঠায়। আগামী নভেম্বরে ভারত মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথে মনুষ্যবিহীন অনুসন্ধানী যান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
গত বছরের জুলাইয়ে দেশের মহাকাশ নীতি এবং বাজেট পর্যালোচনা করতে জাপান মন্ত্রিপরিষদের ক্ষমতার সমান একটি অফিস স্থাপন করেছে। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর উত্তর কোরিয়া মহাকাশ ক্লাবে যোগ দেয়। প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে থাকলেও উত্তর কোরিয়া পৃথিবী পর্যবেক্ষণের জন্য উনহা-৩ নামের একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠায়। দারিদ্র্যপীড়িত জাতির জন্য যদিও এটা একটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। গত বুধবার ন্যারো-৩ নামের একটি রকেট সফলভাবে উেক্ষপণ করায় দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ার পঞ্চম এবং বিশ্বের মধ্যে ১৩তম জাতি হিসেবে আবির্ভূত হলো। দক্ষিণ কোরিয়া এর আগে ২০০৯ এবং ২০১০ সালে প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে রকেট উেক্ষপণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এবার তারা নিজস্ব উদ্যোগে রকেট উেক্ষপণে সক্ষম হলো। তবে রাশিয়া এ কাজে সহযোগিতা করেছে। উত্তর কোরিয়া মহাকাশে উপগ্রহ স্থাপনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর দক্ষিণ কোরিয়া এটি উেক্ষপণ করলো। দেশটি ২০১৮ সালে একেবারে নিজস্ব উদ্যোগে তিনস্তর বিশিষ্ট রকেটের উন্নয়ন সাধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তারা এটি চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ন্যারো পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করছে। পাঠানোর একদিন পর বৃহস্পতিবার আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য পাঠাতে শুরু করেছে। এর আগে মহাকাশে দেশটির উপগ্রহ থাকলেও তা অন্যান্য দেশ থেকে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মহাকাশের দৌড় কি অস্ত্র প্রতিযোগিতার নামান্তর ? পিঙ্কস্টন বলেন, অনেকেই মনে করছেন মহাকাশে সফল কৃত্রম উপগ্রহ স্থাপন এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার একটা বিরাট অংশ। অনেকেই বলছেন, ইতোমধ্যে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে এবং এটা পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেন, আপনি যদি সামরিক খাতে বাজেটের জিডিপির ব্যয়ের অংশ দেখেন তাহলে সেটি অনেক উঁচু হবে যা হয়তো অনেকের কাছে খারাপ মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে জাপান জিডিপির ১শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় করে। তবে উত্তর কোরিয়াও অনেক ব্যয় করে। তাদের ব্যয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি জানা সম্ভব হয় না।
দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যারো-৩ নামের রকেটের গতিবেগ ৮ শত কিলোমিটার, যা আঞ্চলিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে সেটি পূর্ব এশিয়ার জন্য সমস্যারই সৃষ্টি হবে। দক্ষিণ কোরিয়া এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। এটা এ অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক দেশকে তাড়িত করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার পিস নেটওয়ার্কের পরিচালক ইয়ং উকসুর্ক বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে পারে চীনের পূর্ব উপকূলীয় শহর, সাংহাইয়ের অর্থনৈতিক কেন্দ্র, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্দরনগরী জিয়ানজিং এবং কিংদাও এবং চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে। সিউলের এই রকেট উেক্ষপণ ভবিষ্যতের আশংকা হিসেবে দেখা হতে পারে। উকসুর্ক বলেন, উত্তর কোরিয়া উত্তেজিত হবে।
পিঙ্কস্টন বলেন, এ অঞ্চলের মহাকাশ গবেষণা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। কারণ ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়নি। কেবল জাপান দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য একটি কৃত্রিম উপগ্রহ উেক্ষপণ করেছিল। চীন ২০১৬ সালের মধ্যে মহাকাশে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করছে। এজন্য তারা কারিগরি দিক থেকে কার্যক্রমও শুরু করেছে। জন জনসন নামে এক মহাকাশ বিশেষজ্ঞ বলেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াকে ধরতে চীনের আরো অনেক দূর যেতে হবে। কারণ চীনের অগ্রগতি অনেক ধীর এবং স্থির, যেখানে নাসার অগ্রগতি অনেক দ্রুত। এন গোপাল রাজ নামের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, চীনের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া নয়। তবে দেশটি বেশি পেছনেও থাকতে চায় না। জাপান ২০২২ সালের মধ্যে মহাকাশে নভোচারী বহনকারী একটি যান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এছাড়া উন্নত প্রযুক্তির আরো একটি রকেট ২০২০ সালের মধ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে দেশটি।
রাশিয়া ২০৪০ সাল পর্যন্ত মহাকাশ বিষয়ক একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষ পাঠাবে দেশটি। ২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে মঙ্গলগ্রহে ভিন্নরকম এক অভিযানে নামবে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র ওরিয়ন নামের একটি অত্যাধুনিক যান ২০১৪ সালে চাঁদে এবং মঙ্গলগ্রহসহ গ্রহাণুপুঞ্জে পাঠাবে। মনুষ্যবিহীন একটি ফ্লাইট পাঠানোরও পরিকল্পনা আছে প্রভাবশালী এই দেশটির। দেশটির বেসরকারি পর্যায়ে মঙ্গলগ্রহে বসতি স্থাপনের চেষ্টা চলছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে উদ্যোগও নিয়েছে। ২০১০ সালে দেশটির প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বাজেট বাড়ানোরও অঙ্গীকার করেছেন। ২০২৫ সালে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে একটি মহাকাশযান পাঠাবে। এর পাঁচ বছরের মাথায় ২০৩০ সালের মাঝামাঝিতে দেশটি মনুষ্যবাহী মহাকাশ যান পাঠাবে মহাকাশ গবেষণায় সর্বোচ্চ কৃতিত্বের দাবিদার যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর দেশটি মঙ্গলগ্রহে কিউরিওসিটি নামের একটি রোবট পাঠায়। ইউরোপীয় দেশগুলো ২০২০ সালে এরিয়েন-৫ নামের একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রকেট মহাকাশে উেক্ষপণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
