আমরা বাঙালিরা কম বেশি সবাই ‘হাইকোর্ট’ দেখেছি। আমাদের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত প্রতিযোগিতা থাকে একে অন্যকে ‘হাইকোর্ট’ দেখানোর। এবার আমাদের দেশেরই দু’জন ব্যক্তি দু’টি পাখিকে ‘হাইকোর্ট’ দেখানো খেলায় নেমেছেন। আপাতত পাখি দু’টি অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট দেখেছে। তবে এভাবে চলতে থাকলে হাইকোর্ট দেখাটাও অসম্ভব নয়। আসলে আমাদের এই রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশে রঙ্গ-তামাশার কোনো শেষ নেই। পদ্মাসেতু থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানো, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সরকারি দল ও পুলিশের হানাহানি-মারামারি, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বিরোধী দলীয় নেত্রীর বিতর্কিত কলাম ছাপানো, একের পর এক নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ইত্যাদি নিয়ে যখন রাজনৈতিক অঙ্গন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম সরগরম ঠিক তখন একজোড়া পোষা পাখির মালিকানা এবং পাখি দুটোর একসঙ্গে থাকা না থাকা নিয়ে তাদের মালিক দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্ব্ব আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিষয়টি রসিক মহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
নাটকীয় এই ঘটনার শুরু আজ থেকে চার বছর আগে। ঢাকার ইস্কাটন এলাকার বাসিন্দা মি. সেলিম বাড়ি নির্মাণ সংক্রান্ত কিছু ঝামেলার কারণে তার পোষা বিরল প্রজাতির একটি ম্যাকাও পাখি ড. ওয়াদুদের হেফাজতে দিয়ে আসেন। পাখিটির একাকীত্বে কাতর হয়ে ড. আবদুল ওয়াদুদ আরেকটি ম্যাকাও পাখি কিনে তার সঙ্গী বানান এবং এই পাখি জোড়ার একটি বাচ্চাও হয়।
বেশ সুখেই চলছিল ড. ওয়াদুদ এবং তার ‘সংগৃহীত’ পাখির জীবন। কিন্তু সুখ তো আমাদের দেশের মানুষের কপালে বেশি দিন সয় না। ড. ওয়াদুদ ও তার সংগৃহীত পাখিদের কপালেও সয়নি। মি. সেলিম তার পাখিটি বন্ধু ড. ওয়াদুদের কাছে ফেরত চাইতে গেলে বিপত্তি বাধে। ড. ওয়াদুদ পাখিটি ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। পাখিটি ফেরত চেয়ে এবং না পেয়ে ক্ষুব্ধ সেলিম কলাবাগান থানায় ড. ওয়াদুদের নামে সাধারণ ডায়েরি করেন। ওদিকে ড. ওয়াদুদও চুপ করে বসে থাকেননি। পাখি দুটোকে নিজের হেফাজতে রাখার জন্য তিনিও পাল্টা জিডি করেন। শুরু হয়ে যায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির লড়াইয়ের মত এক লড়াই। ড. ওয়াদুদের যুক্তি, ২০০৮ সাল থেকে এতদিন তিনি এই পাখির যত্ন নিয়েছেন, তার জন্য সঙ্গী খুঁজে এনেছেন, এর পেছনে শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করেছেন, তার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছেন। এখন জোড়া ভাঙলে দু’টি পাখিই চরম একাকীত্বের সঙ্কটে পড়বে, যা হবে নির্যাতনের সামিল।
এরপর বিষয়টি আদালতে গড়ালে দু’জনের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত পাখি দুটোকে যার যার মালিকের কাছে বুঝিয়ে দিতে এ মাসের শুরুতে নির্দেশ দেন এবং সেই মোতাবেক পুলিশ মি. সেলিমের পাখিটিকে তার কাছে পৌঁছে দেয়ার অনন্য দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মি. ওয়াদুদ এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দুটো পাখিকে আলাদা করায় তাদের সংসার ভেঙে গেছে। কাজেই তাদের এক সঙ্গে বসবাসের নির্দেশনা চেয়ে তিনি আবারও আদালতের দ্বারস্থ হন।
নজিরবিহীন এই মামলার সিদ্ধান্ত দিতে আদালতকে হিমশিম খেতে হয়। মানুষ নিয়ে কায়কারবারে অভ্যস্ত আদালতের কাছে পশু-পাখি, জন্তু-জানোয়ার নিয়ে বিচার করার বিষয়টি একবারেই অভিনব। কাজেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়াটা আদালতের জন্য বেশ ঝামেলার কাজই বটে। আদালত অবশেষে দু’পক্ষকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে এই পাখি বিষয়ক রঙ্গনাট্যে শুধু দু’জন রসিক ব্যক্তিই নন, আরও অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন। শুনানিকালে প্রথম ম্যাকাওয়ের সংসার না ভাঙার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান বাহালুল হক চৌধুরীসহ ২০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষরিত পত্রও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
প্রথম দফায় শুনানি শেষে বিচারক আদেশে বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী নালিশী পাখিটি কোন্ পক্ষের হেফাজতে থাকবে, এ ব্যাপারে আদেশ দেয়ার এখতিয়ার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নয়। আগ্রহী সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার অধিকার আদায়ের জন্য উপযুক্ত আদালতে গিয়ে বিচার প্রার্থনা করতে পারেন বলে সুপারিশ করেন।
বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অপরাধ দমনের জন্যই আইন-আদালত। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আদালতে ‘মানবঘটিত’ যাবতীয় বিষয় নিয়েই কায়কারবার করা হয়। এখন পশু-পাখির অধিকার, তাদের সংসার টেকা না-টেকা নিয়ে মানুষের আদালতের পক্ষে রায় দেয়াটা কী নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য হবে? পাখির অধিকার প্রতিষ্ঠায় উচিত, পাখিদের নিয়ে আলাদা আদালত গঠন করা; কিন্তু তা কী আদৌ সম্ভব? তা যদি সম্ভব না হয়, মানুষের আদালতে যদি পাখিদের সংসার টেকা না-টেকার রায় ঘোষণা করা হয়, পাখিরা যদি এতে ক্ষেপে যায়? তারা যদি জামায়াতিদের মত মানুষের আদালত ও বিচার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে একাট্টা হয়, চোরাগোপ্তা হামলা চালায়, সব কিছু লণ্ড-ভণ্ড করে দেয় তাহলে কী হবে? পুলিশ কী এক্ষেত্রে পিপার গ্যাস ব্যবহার করবে? না কী গুলি চালাবে? না কী মামলা দেবে?
প্রশ্ন আরও আছে। পাখিকে বেঁধে রেখে তার জন্য কল্পিত স্বর্গসংসার বানানোর অধিকার মানুষকে কে দিয়েছে? একজন মানুষকে শেকলে বেঁধে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় রেখে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা দিলেই কী তিনি হাসবেন? বন্দিত্ব কী কখনও সুখ-শান্তি-স্বস্তি আনতে পারে? পাখাহীন মানুষ যদি বন্দি থাকতে না পারে, পাখাযুক্ত পাখি কী করে বন্দি থাকবে? আমরা যেমন মানুষের মুক্তি চাই, তেমনি পাখিরও মুক্তি চাওয়া উচিত নয় কী?
জোর করে কারও ভাল করাও যায় না, ভাল করতে যাওয়া উচিতও নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় আমাদের দেশের বহু আলোচিত একটি রাজনৈতিক অধ্যায় ‘ওয়ান ইলেভেনের’ ঘটনা। যারা রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধ মালিক, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র হনন আর কালিমা লেপনের অপচেষ্টা ছাড়া ওয়ান ইলেভেন আমাদের দেশকে কী দিয়েছিল? সেই সময় পাহাড় সমান অভিযোগের কথা বলে আমাদের অনেক জাতীয় নেতাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে; কিন্তু তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে তিল পরিমাণ প্রমাণও দেখাতে পারেনি। শান্ত্রি-সেপাই দিয়ে অনেক ঘটা করে কোনো কোনো জাতীয় নেতার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ‘লুঙ্গি-গামছা-অন্তর্বাস-বোতল-কৌটা-পশু-পাখি’ জব্দ করে ওয়ান ইলেভেনওয়ালারা ‘হাতি’ জব্দ করার কৃতিত্ব ও উল্লাস দেখিয়েছেন। তথাকথিত দুর্নীতি দমন আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তুলে অনির্বাচিত এই ব্যক্তিরা মহাসুখে প্রায় দুই বছর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ইচ্ছে মত কাবাব-পরোটা খেয়েছেন। তাদের কাজের না ছিল কোনো জবাবদিহিতা, না ছিল কোনো স্বচ্ছতা। আজও এই ওয়ান ইলেভেনওয়ালারা দেশকে উদ্ধার করেছেন বলে ঘোষণা দেন। আমাদের আজকের আলোচ্য ওই ম্যাকাও পাখির ‘সংসার জোড়া’ দেয়ার আকাঙ্ক্ষার মত তারা আমাদের ‘গণতন্ত্রের সংসার’ জোড়া দিতে ভূমিকা পালন করেছেন বলে দাবি করেন। আমাদের মধ্যে অনেক বেশরম তা কবুলও করেন। আসলে আমাদের এই ‘রঙ্গ ভরা বঙ্গদেশে’ অনেক কিছুই হচ্ছে। আরও অনেক কিছুই হয়তো হবে। আপাতত আমাদের সব কিছু উপভোগ করা ছাড়া তেমন কিছু করণীয় আছে বলে মনে হয় না। যাক সে কথা।
তবে আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত যে, বন্যেরা বনে সুন্দর শিশু মাতৃক্রোড়ে। মানুষের শখের শিকলে বন্দি দুই অসহায় পাখির জীবন আমাদের জন্য কোনো আনন্দ-বিনোদনের খবর নয়। বিষয়টি ভাবনারও। মানুষের আদালতে পাখিদের বন্দিত্ব নিয়ে কেউ আদালতে যাননি। তারা একসঙ্গে থাকতে পারবে কিনা সেটা আলোচ্য বিষয় হতে পারে না। দুটো পাখিকে শেকলে বেঁধে আদালতে নেয়া হলো; অথচ এ বিষয়টি নিয়ে কারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই (অবশ্য মানুষকেও শেকলে বেঁধে আদালতে নেয়া হয়। পত্রিকার পাতায় তা ছাপাও হয়। এ আর এমনকি কথা)! কিন্তু ওই ম্যাকাও পাখি দুটো কী খুন, ধর্ষণ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি, হত্যাচেষ্টা বা অন্য কোনো অপরাধমূলক মামলার আসামি? তাহলে কেন তাদের শেকলে বেঁধে আদালতে নেয়া হলো? কেন দুটো পাখি এক সঙ্গে থাকার বিষয়টি পাখিদের ওপর ছেড়ে দেয়া হলো না। কেন তাদের শেকল ছিন্নের আদেশ দেয়া হলো না? হায় মনুষ্যত্ব! হায় পাখিত্ব!
পশু-পাখি নিয়ে আমাদের দেশের সাধারণ জনগণের যে আত্মঘাতী নীতি, দেশ নিয়েও আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের একই রকম আত্মঘাতী অবস্থান। আমাদের প্রধান দুই দল এবং দুই দলের প্রধান দুই নেত্রীর পারস্পরিক বৈরিতা এখন অলঙ্ঘনীয় নিয়তি বা ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়েছে। একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ ও পারস্পরিক সর্বনাশ কামনাই এই দুই দল এবং দুই নেত্রীর একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। বিএনপি চায় না আওয়ামী লীগ আর এক মুহূর্তের জন্য ক্ষমতায় থাকুক। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ চায় বিএনপি কখনই আর ক্ষমতায় না আসুক। উভয় দলই ক্ষমতা চায়, ক্ষমতায় থাকতে চায়, একই সঙ্গে অন্যদলের ধ্বংস বা সর্বনাশও চায়।
এই চাওয়ায় কোনো খাদ নেই, নেই কোনো গোঁজামিল। রাজনৈতিক দলগুলোর এ সর্বনাশা ও আত্মঘাতী নীতির কারণে আমাদের দেশ ক্রমেই পেছনে চলে যাচ্ছে। নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস দিন দিন বাড়ছে। সব সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাড়ছে হতাশা। আর এসবের হাত ধরে বিকশিত হচ্ছে মৌলবাদী চক্রসহ অন্ধকারের অদৃশ্য অপশক্তি। সবাই মিলে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে করছে নির্মম টানাহেঁচড়া।
অথচ আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও এসব দলের নেতানেত্রীরা সবাই দেশপ্রেমের কথা বলেন, দেশের কল্যাণ চান, গণতন্ত্র চর্চা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের কথা বলেন। আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলেন। তারা বলেন এক; কিন্তু করেন ঠিক তার উল্টো। কী এক অদৃশ্য মোহের বশে ও রিপুর তাড়নায় আমাদের নেতানেত্রীরা পারস্পরিক খেয়োখেয়ি ও ঝগড়া-কলহকেই নীতি হিসাবে বেছে নিয়েছেন। এর ফলে দেশের বারোটা বাজছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জাতি। আর উপকৃত হচ্ছে মতলববাজ সুবিধাবাদী শ্রেণি; অন্ধকারের কীটরা। তবু কারও হুঁশ নেই। সংশ্লিষ্ট নেতানেত্রীদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটবে এমন কোনো সম্ভাবনাও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
++লেখক : কলামিস্ট
