আগামী ১৫ মার্চ সিরিয়া যুদ্ধের দুই বছর পূর্ণ হবে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত ৬০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ৬ লাখের বেশি মানুষ শরণার্থী হয়েছে। প্রতিদিন লাশের মিছিলে যোগ দিচ্ছে কোলের শিশু থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষ। সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব স্বার্থগত কারণে নানামুখী সমীকরণে ব্যস্ত। আরব রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় দুইভাগ হয়ে সরকার ও বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে আসছে। চীন রাশিয়ার ভেটোর কারণে জাতিসংঘ বিশেষ দূত পাঠানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানামুখি বাস্তবতায় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে মৃত্যুর মিছিলে নিত্যদিন যোগ দিচ্ছে নিরীহ বেসামরিক প্রাণ।
তিউনিসিয়া, মিসর ও ইয়েমেনে জনগণের বিপ্লব দ্রুত সময়ে সফলতা পেলেও সিরিয়া সঙ্কট ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে বহুবিধ কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি তার একটি কারণ। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে প্রজাতান্ত্রিক ইরান। গেরিলা কৌশলের আদলে ইরানের সমর্থক অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকে একেক করে কাবু ও অক্ষম করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই উদ্দেশ্যেই আরব বসন্তের ধারাবাহিকতায় সিরিয়ার গণজাগরণকে কাজে লাগাতে চাইছে তারা। কারণ সিরিয়ার বর্তমান শাসক ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত এবং আরব রাজতন্ত্র, ওয়াহাবিজম ও আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতির ঘোরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের আসাদ বধ পরিকল্পনায় বাধ সেজেছে এ অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোতে আরব বসন্ত পরবর্তী ফলাফল। মিসর, তিউনিশিয়া, ইয়েমেন এবং লিবিয়ার বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা কট্টর ইসলামপন্থিদের হাতে চলে যাওয়ায় পশ্চিমা নীতি-নির্ধারকরা সিরিয়া নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আসাদের বিকল্প হিসেবে সেখানে সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিলকে (এসএনসি) প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। কিন্তু বিদ্রোহী গ্রুপ থেকে শুরু করে সাধারণ সিরীয়রা এসএনসির নেতৃত্ব মেনে নিতে চাইছে না। হেজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুড সমর্থিত ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল অথবা ইসলামী দলগুলো যদি জনগণের সমর্থন নিয়ে সিরিয়ায় আগামী দিনে সরকার গঠন করে তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াবে। যেমনটি হয়েছে অন্যান্য বিপ্লব সংঘটিত রাষ্ট্রে। সিরিয়া সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, সেদেশে বিদ্যমান রাসায়নিক অস্ত্র। বর্তমানে সেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও যুদ্ধ পরবর্তীতে সেগুলো যদি কোনোক্রমে বিপ্লবীদের হাতে ছড়িয়ে পড়ে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ঝুঁকির মুখে পড়বে। সবকিছু বিবেচনায় ওবামা প্রশাসন সিরিয়ার বিষয়ে চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। যোগ হয়েছে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সঙ্কট। সিরিয়ায় আসাদ বাহিনী ও বিদ্রোহীদের দখল-পাল্টা দখলের খেলায় আসাদকে পরাজিত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিয়ে বিদেশি সেনা পাঠাতে হবে, একই সঙ্গে ব্যয়ভারও বহন করতে হবে-এটি ওবামার অজানা নয়। কারণ সিরিয়ার প্রায় ৪ লাখ প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে হটানো বিদ্রোহীদের একার শক্তির মাধ্যমে এখন যে আর সম্ভব নয়, অবস্থাদৃষ্টে সেটি মনে না হওয়ার কারণ নেই।
বহুমুখী স্বার্থের সমীকরণ কিভাবে মিলবে এবং সিরিয়া সঙ্কটের প্রকৃত সমাধান কোন পথে আসবে তা বলা কঠিন। তবে যে সব বিকল্প পথগুলো এখনো দৃশ্যমান সেগুলো হচ্ছে- এক. সরকারি সেনারা বিদ্রোহীদের পরাজিত করে দেশের সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে। সেক্ষেত্রে হতাহতের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে সরকার জনগণের চাহিদা মাফিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করবে। দুই. বিদ্রোহীদের কাছে আসাদ বাহিনীর পরাজয়। তবে বর্তমানে সরকার এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে শক্তির যে ভারসাম্য তা কিন্তু এ সম্ভাবনাকে মোটেও সমর্থন করে না। তিন: সশস্ত্র বাহিনীর আসাদের পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দেওয়া। এমনটা হলে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। ফলে গণআন্দোলনে জনগণের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। চার: বহির্বিশ্বের সামরিক হস্তক্ষেপে আসাদ বাহিনীকে পরাজিত করা। সেক্ষেত্রে শাসন ক্ষমতায় পশ্চিমাদের আশীর্বাদপুষ্টরা চলে আসতে পারে। অথবা অন্যান্য বিপ্লব সংঘটিত রাষ্ট্রের মতো কট্টর ইসলামিস্টদের ক্ষমতায় আসাটাও অস্বাভাবিক নয়। সেক্ষেত্রে সিরিয়ায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি স্বীকৃতি পাবে এবং সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে না। পাঁচ: জোটভুক্ত রাষ্ট্র তুরস্কের দাবি প্রাধান্য দিয়ে ন্যাটো দামেস্কে সৈন্য প্রেরণ করলে সংঘাত বেড়ে যাবে। কারণ ইরান, লেবাননের হেজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড তখন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সিরিয়ার পক্ষে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিতে পারে। ছয়: আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরকে নিয়ে কূটনীতিক চতুষ্টয় (কোয়ার্টেট) মিলে দুপক্ষের সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে সঙ্কট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে। সাত: শর্তহীনভাবে দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সিরিয়াকে কেন্দ্র করে নিজ নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ উদ্যেগ প্রয়োজন। জাতিসংঘের উচিত এই বিকল্পটি বেশি জোর দেওয়া। হত্যা, নিপীড়নের পথ পরিহার করে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট আসাদ একটা শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাকর সমাধান বের করতে পারলে তা হতো এই প্রাণঘাতী সংঘাত বন্ধের উত্তম উপায়। সেটি সম্ভব হলে দামেস্কে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ বন্ধের পাশাপাশি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথও প্রসারিত হবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
