বাংলাদেশি নারী ও শিশু পাচার

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১৯
বাংলাদেশ হইতে নারী ও শিশু পাচারের হার ক্রমাগত বাড়িয়া চলিয়াছে। ভারতের মুম্বাই, হায়দারাবাদ ও কলকাতাভিত্তিক নারীপাচার চক্রগুলি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে নেটওয়ার্ক গড়িয়া তুলিয়াছে। আর এই নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়িতেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন মফস্বলের কলেজপড়ুয়া ও গ্রামের উঠতি বয়সী মেয়ে ও শিশুরা। সম্প্রতি ভারতের কেরালা রাজ্যপুলিশ বাংলাদেশি এক নারীকে উদ্ধার করিবার পর প্রতিবেদনে উল্লেখ করিয়াছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হইতে ভারতীয় চক্রগুলি দালালের মাধ্যমে ৩০ হইতে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে নারী সংগ্রহ করিতেছে। তাহাদেরকে ভারতের বিভিন্ন পতিতাপল্লী এবং আবাসিক হোটেলে জোরপূর্বক দেহ ব্যবসা করানো হইতেছে। উঠতি বয়সী এবং সুন্দরী নারীদেরকে পাকিস্তান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যেও পাচার করা হইতেছে। অপরাধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের একটি আকর্ষণীয় পথ হইল মানব পাচার। ফলে, বিশ্বজুড়িয়াই বিগত কয়েক দশকে নারী ও শিশু পাচার আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ নারী ও শিশু পাচারের একটি প্রধান উত্?স এবং ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসাবে কুখ্যাতি অর্জন করিয়াছে। সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীন ভঙ্গুর নারী ও শিশুরাই এই অপরাধ কর্মকাণ্ডের সহজ শিকারে পরিণত হইতেছে। অন্যদিকে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব পাচারকারী চক্রগুলিকে উত্সাহিত করিয়া চলিয়াছে। বলিতেই হইবে, অবৈধ পথে নারী ও শিশু পাচার ভয়াবহ রূপ ধারণ করিয়াছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী গত ১০ বত্সরে বাংলাদেশ হইতে তিন লক্ষাধিক নারী ও শিশু ভারতে পাচার হইয়াছে। তবে বিভিন্ন এনজিওর হিসাব মতে পাচারকৃত নারী ও শিশুর সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। ইতোপূর্বে, টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছিল, প্রতি বত্সর বাংলাদেশ হইতে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হইতেছে। পাচারকারীরা দেশের ১৮টি স্থান দিয়া ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত ব্যবহার করিয়া পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচার করিতেছে। পাচারের শিকার অধিকাংশ নারীর স্থান হইতেছে ভারতের যৌন পল্লীতে। উপরন্তু, বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ অধিক আয়ের আশায় নিয়মিতই সহস্রাধিক নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় বিভিন্ন দেশে অভিবাসন গ্রহণ করিতেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি নির্দেশনা না মানিয়া প্রতিষ্ঠানগুলি তাহাদের নিকট হইতে অধিক অর্থ আদায় করে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করিয়া শর্ত অনুযায়ী কাজ দেয় না, বিনা মজুরিতে দাসোচিত শ্রম দিতে বাধ্য করে, এরূপ ভাগ্যাহতদের উপর যৌন হয়রানিও আকছার ঘটিতে থাকে। চাকরি আর মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভনে পড়িয়া তাহারা বিদেশ-বিভুঁইয়ে অমানবিক জীবনযাপনে বাধ্য হইতেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের মতে নারী ও শিশু পাচার রোধে বাংলাদেশের ন্যূনতম প্রস্তুতিটুকুও নাই। সরকার সম্প্রতি আইনী সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করিলেও প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতি এবং অসাধু নিয়োগদাতা, দালাল, পাচারকারী চক্রগুলির আঁঁতাতের কারণে অবস্থার উন্নতি ঘটিতেছে না। প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের সংবিধানে ‘মানব পাচার’ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। তবে, আমাদের সংবিধানে সরাসরিভাবে ‘মানব পাচার’ নিষিদ্ধ করা না হইলেও তৃতীয় ভাগের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলিকে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য রক্ষাকবচ হিসাবে ব্যবহার করা যাইতে পারে। পাচার প্রতিরোধ, অপরাধের বিচার এবং পাচারের কবল হইতে উদ্ধারকৃতদের সুরক্ষায় জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতীয় সরকারসমূহ যৌথ ও এককভাবে বিভিন্নমুখি তত্পরতা বাড়াইলেও অপরাধের ক্রমবর্ধমান বিস্তৃতির সহিত প্রতিরোধমূলক তত্পরতা তাল মিলাইতে পারিতেছে না। এরূপ পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক পতিতাবৃত্তি ও অবৈধ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারী ও শিশুর ক্রমবর্ধমান পাচার রোধে সংবিধানে অনুচ্ছেদ সংযোজন, নবপ্রণীত আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন