সামাজিক মূল্যবোধ বনাম সামাজিক অস্থিরতা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:২১
সারা পৃথিবীতে শিক্ষার হার বাড়ছে, মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে: শিক্ষার সুফল যেন সমাজ পাচ্ছে না। বিশ্ব সভ্যতা যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, হারাচ্ছে মানবিকতা। ফলে ক্রমশই বাড়ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা, বাড়ছে অশ্লীলতা, নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কগুলো, সমাজ হয়ে উঠছে অস্থির। মানব সমাজে পচন দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে এর বহি:প্রকাশ ঘটছে। অন্যদিকে বিশ্ব থেমে নেই, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, প্রযুক্তি, সভ্যতা, উন্নয়ন সবকিছুই এগিয়ে চলছে। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন লক্ষ্যহারা হয়ে পড়েছে, যেন পথহারা পথিকের ন্যায় কোথাও ঐক্য ও সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা বিশ্ব আমাদের সমাজ, মানব সমাজ। এ সমাজের অংশ হিসাবে আমাদের দেশ এবং সমাজও নানা সামাজিক অস্থিরতায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মানব সমাজের সার্বিক পরিবেশকে দুটি অংশে পৃথক করা যায়। একটি সামাজিক পরিবেশ, আর অন্যটি প্রাকৃতিক পরিবেশ। এদুটোর একটিও আর সুস্থ ও স্বাভাবিক নেই, হয়ে পড়েছে ভারসাম্যহীন। বৈজ্ঞানিক মহল থেকে এ ব্যাপারে বার বার সতর্ক সংকেত দেয়া হচ্ছে। একদিকে সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার ফলে অযাচিত যুদ্ধ, হত্যা, ধর্ষণ, মারামারি, কাটাকাটি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, লুটতরাজ ইত্যাদি ব্যাধি সামাজিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্টের ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, অগ্নুত্পাত, ভূমিকম্প, বন্যা, খরা ইত্যাদি সময়ে-অসময়ে অস্বাভাবিকভাবে মহাবিপর্যয় ডেকে আনছে, প্রকৃতি হয়ে উঠছে লাগামহীন ও চরম খেয়ালী। এখন, বিশ্ব মানবতার সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে, কোন আদর্শের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সামাজিক ও প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীটা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। এ উভয়বিধ সমস্যার প্রধানতম কারণগুলো মোটামুটি আমাদের সবার জানা-ভোগবাদী, বস্তুবাদী ও পুঁজিবাদী মানসিকতা, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আরো বহুবিধ। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবশ্য বিশ্বব্যাপী অনেক কথা হচ্ছে, অনেক চুক্তি হচ্ছে, অনেক পরিবেশবাদী গ্রুপ কাজ করছে। বিশ্বমানবতার স্বার্থে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ অর্থনীতির উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এ সামাজিক পরিবেশের ভারসাম্য, যার দ্বারা আমাদের মননশীলতা প্রভাবিত হয়, আমাদের সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা যার ওপর নির্ভরশীল, তার কি অবস্থা? অনেক সমাধানও দেয়া হচ্ছে, নতুন নতুন আইন হচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক তত্ত্ব আসছে, কিন্তু সুস্থ ধারার সামাজিক পরিবেশ বিরাজ করছে না। বরং দিনে দিনে বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কগুলো নষ্ট হচ্ছে। চাওয়া-পাওয়ার ব্যবধান হয়ে যাচ্ছে অনেক বেশি, ফলে আত্মহত্যা ও হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলছে। মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সামাজিক সম্পর্কের এমন নির্ভেজাল জায়গাগুলোতে ফাটল ধরছে, ঢুকে পড়ছে অবিশ্বাস। ফলে সমাজ ছাড়া হচ্ছে সুখ-শান্তি। সবচেয়ে বেশি অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে যুব সমাজ, যারা একটি দেশ বা জাতির ভবিষ্যত্। তারা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ছে, হয়ে যাচ্ছে বখাটে, মদ্যপ, ধর্ষক ও সন্ত্রাসী। আর যারাও বা শিক্ষিত হচ্ছে তারাও ভোগবাদী ও লোভাতুর মানসিকতার কারণে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধগুলো রক্ষা করে চলতে পারছে না, বনে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ, সুদখোর ও ঘুষখোর। ফলে সমাজ ছাড়া হচ্ছে ন্যায়নীতি ও ন্যায়-বিচার। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাজের সকল ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে, দেখা যাচ্ছে অশনিসংকেত। আর দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত নাগরিক হয়েও আমরা যেন তাতে গা এলিয়ে দিচ্ছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে যে সামাজিক অস্থিরতাসমূহ প্রকট হয়ে দেখা দিবে, তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র যেকোন দেশের জন্য তা মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে। কেননা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোই এসব অস্থিরতা সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। মানব সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রে এ অস্থিরতাসমূহের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা, ওয়ালস্ট্রিট দখল করে। আন্দোলন, ইউরো জোন সংকট, চীনে চরম দুর্নীতি প্রভৃতি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মূল্যবোধহীন উন্নয়ন কোন টেকসই (Sustainable) মানবতাবাদী (Humanistic) উন্নয়ন নয়। এখন আমাদের উচিত হবে উন্নত বিশ্বের ভাল-মন্দ দিকসমূহ বিবেচনা করে সচেতন পদক্ষেপে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। অন্ধ অনুকরণ নয়। কাজেই এসব মানবিক বিপর্যয় ও অস্থিরতা রোধে আমাদের আশু কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আধুনিকতা ও উদারতার নামে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে সমাজ থেকে উত্পাটন করে, সামাজিক ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিরতা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা বাতুলতা বৈ কিছু নয়। অথচ স্বেচ্ছায় ও সানন্দে নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ পালনের উত্সাহ ও নিদের্শনা মানুষ ধর্ম থেকে পেতে পারে। আজ মানুষের প্রয়োজনেই মানুষকে আবার মানবিকতার চর্চা করতে হবে, আর সুস্থ ধারার সমাজ গড়তে লালন করতে হবে নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো। কেননা আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সুস্থ ধারায় বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ও বখে যাওয়া রোধ করতে হবে, এর বিকল্প নেই।  লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ৪র্থ বর্ষ। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন