ট্রেনে যাত্রীর সার্বিক নিরাপত্তা বনাম দুর্বৃত্তদের চরম নিষ্ঠুরতা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:২৩
দূর পথে ভ্রমণের কথা মাথায় এলেই নিরাপদ যোগাযোগের বাহক হিসেবে যে যানটার কথা প্রথমেই সকলের মনে পড়ে তা হলো ট্রেন। এদেশের অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ ও দুর্ঘটনামুক্ত যোগাযোগের বাহক হিসেবে ট্রেনকেই অধিক পছন্দ করে। কেননা এদেশে ট্রেনই হচ্ছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের স্বল্পমূল্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু আমরা কি এই ট্রেনকে যাত্রীদের যোগাযোগের নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে পরিণত করতে পেরেছি? পারিনি, শুধু পেরেছি ট্রেনের সেবার বিপরীতে এক শ্রেণীর দুর্বৃত্তদের দ্বারা যাত্রী হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, মালামাল লুট, যাত্রীদের নানামুখী হয়রানির শিকারে পরিণত করতে। বর্তমানে ট্রেনে ঐসব দুর্বৃত্ত তথা মানুষরূপী নরপশুরা যাত্রীদের কাছ থেকে জোড়পূর্বক যতসামান্য অর্থ, মোবাইল ও অলঙ্কার ছিনতাই বা ডাকাতির নামে নিরীহ যাত্রীদের চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে অসভ্যতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে চলছে। দুর্বৃত্ত কর্তৃক সংগঠিত এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের বিপরীতে উক্ত হত্যাকে অনেকেই আবার দুর্ঘটনা ও আত্মহত্যা বলে অবিহিত করছে। ফলে অপরাধীরা সর্বদাই থেকে যাচ্ছে আইনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। সভ্য সমাজে এই শ্রেণী মানুষের নিষ্ঠুরতা ও ববর্রতা এমন এক পর্যায়ে নেমেছে যে, সামান্য অর্থের লোভে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য ও নিকৃষ্ট কর্ম অহরহ ঘটিয়ে চলছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ পড়ে জানতে পারলাম ঢাকাগামী ট্রেনে গমনকারী একজন মহিলাসহ মোট চারজন যাত্রীকে একদল ডাকাত নামধারী কিছু দুর্বৃত্ত ট্রেন থেকে ফেলে যাত্রীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ডাকাতির এধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এক কথায় সত্যিই লোমহর্ষক, বেদনাদায়ক ও কষ্টের। বেশ কিছুদিন যাবত্ পত্রিকার পাতা খুললেই কোন কোন স্থানে ট্রেনে হত্যার মতো জঘন্য ও নৃসংশ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু উক্ত হত্যার বিপরীতে এই সেক্টরে সংশ্লিষ্টদের ও নীতি-নির্ধারকদের অধিক উদাসিনতায়, হত্যাকে আত্মহত্যার মতো ঘটনায় পরিণত করা, অনৈতিকতা, দায়সারা তদন্ত, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, সময়ক্ষেপণ, নিহত স্বজনদের নানামুখী হয়রানির স্বীকার, দোষীদের শাস্তি প্রদানে প্রশাসনের ব্যর্থতা, হত্যার বিপরীতে দোষীরা সর্বদা প্রশাসনের নাগালের বাইরে থাকার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা ট্রেনের সেবার মানোন্নয়ন ও যাত্রী নিরাপত্তা বিঘ্নের প্রধান অন্তরায় বলে মনে করি। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তে রেল কর্তৃপক্ষের সর্বদা নীরব ভূমিকা পালন করা এধরনের ঘটনার বিস্তারের প্রধান কারণ মনে করি। যদিও বর্তমান সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ট্রেনে যাত্রীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে ট্রেনে অধিক নিরাপত্তাকর্মী ব্যবস্থা জোরদার করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ উক্ত ঘোষণার কোন বাস্তবায়ন এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। যা সত্যিই বেদনাদায়ক। রেলে প্রয়োজন অনুয়ায়ী নিরাপত্তা পুলিশ সংখ্যা এখন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়নি। অন্যান্য দেশের মতো রেলকে এখনও আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি। রেলের সেবার মানের সার্বিক অগ্রগতি এখন পর্যন্ত এদেশে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এর ফলশ্রুতিতে ডাকাতনামী দুর্বৃত্তরা ট্রেনে এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় দুর্বৃত্তরা প্রশাসনের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকায় এধরনের ঘটনার প্রবণতা সমাজে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা যাত্রী সাধারণের মনে রেলকে নিয়ে চরম ভীতি ও সংশয় কাজ করছে। যা ট্রেনের সেবা খাতে চরম বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বর্তমানে ট্রেনে প্রতিনিয়ত এধরনের হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা সংগঠনের কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো আমাদের মনে অধিক দাগ কাটে তা হচ্ছে দুর্বৃত্তরা মনে হয় তাদের অপকর্ম ও হত্যার বাহক হিসেবে এখন ট্রেনকেই বেছে নিয়েছে। কারণ উক্ত হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যার নামে অপরাধের দায় এড়ানো সম্ভব বিধায় দুর্বৃত্ত কর্তৃক প্রতিনিয়ত ট্রেনে এধরনের মৃত্যুর ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করছে। এতে দুর্বৃত্তরা হয়তো তাদের হত্যাকে রেলের দায়সারা তদন্ত ও আত্মহত্যার কথা বলে অতি সহজে পার পেতে পারে। এধরনের হত্যাকাণ্ডে দোষীদের উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি দানে প্রশাসনের ব্যর্থতা এক্ষেত্রে অধিক দায়ী। হত্যার সঠিক রহস্য উন্মোচনে রেল কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অধিক উদাসিনতা; ট্রেনের এক বগির সঙ্গে অন্য বগির মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংযোগ না থাকার কারণে দুর্বৃত্তরা সহজেই এধরনের ঘটনা ঘটানোর সক্ষমতা; মাদকসেবীদের নানামুখী ছিনতাই তত্পরতা; ট্রেনে যাত্রীদের সেবা দানে নিয়োজিত এন্টেন্ডেন্সদের অনৈতিকা ও দায়িত্বের প্রতি চরম অবহেলা; ট্রেনের কিছু অনৈতিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থ লাভের উদ্দেশ্যে চোরাকারবারী ও কালোবাজারীদের অবৈধ কাজে তাদের সহযোগিতা দানে ট্রেনকে যেখানে-সেখানে থামানোর প্রবণতা; দুর্বৃত্তদের জন্য মুখ্যম, উপযুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সঠিক নজরদারীর অভাব; ট্রেনে নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত পুলিশের স্বল্পতাসহ অনুন্নত সেবা ব্যবস্থা মূলত: এরূপ হত্যাকাণ্ডের জন্য অধিক দায়ী। এরূপ পরিস্থিতিতে সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রশ্ন ট্রেনে এধরনের নির্মম হত্যার ঘটনায় আর কতদিন চলবে? আর কতদিন দুর্বৃত্তদের দ্বারা যাত্রীদের ভাগ্যে করুণ ও নির্মম মৃত্যুর স্বীকার হতে হবে? সরকার তথা রেল কর্তৃপক্ষ কি এ ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না? লেখক :লাইব্রেরিয়ান