রাজস্ব আদায়ে শ্লথগতির কারণ খুঁজিয়া দেখিতে হইবে

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৭
চলতি অর্থবত্সরের প্রথমার্ধে অর্থাত্ জুলাই হইতে ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয় সন্তোষজনক নয়। লক্ষ্যমাত্রার চাইতে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হইয়াছে এই সময়কালে। অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান মনে করিতেছেন যে, বত্সরের শেষ পর্যায়ে আসিয়া মোট রাজস্ব সংগ্রহ তাহার লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছিবে। বাংলাদেশ না হইয়া পেট্রোডলার অর্জনকারী কোন দেশে কর-রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এই রকম ঘাটতি দেখা দিলে তাহা কোন পত্রিকার খবরে আসিত কিনা তাহাতে যথেষ্ট সন্দেহ রহিয়াছে। কারণ ঐ সকল দেশে কর বহির্ভূত রাজস্বের পরিমাণ এত বেশি যে, কর হইতে প্রাপ্ত রাজস্ব আদায়ে এই রকম কম-বেশিতে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থানায় চাপ সৃষ্টি হয় না। কিন্তু আমরা জানি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনুন্নয়ন বাজেট কিংবা রাজস্ব বাজেটের পুরোটাই আসে রাজস্ব আয় হইতে। রাজস্ব আয় কম হওয়ায় উন্নয়ন বাজেটের প্রায় একশত ভাগ বিকল্প উত্স হইতে অর্থায়ন করিতে হয়। সেইজন্য আমাদেরকে এই রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে অতি সতর্ক হইতে হয়। এনবিআর-এর চেয়ারম্যান সাহেবের অনুমান ঠিক হইলেই ভালো। তবে আমাদেরকে একটু চিন্তা করিয়া দেখিতে হইবে অর্থবত্সরের প্রথমার্ধে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করিতে পারি নাই কেন আমরা। সেই ক্ষেত্রে সবচাইতে প্রাসঙ্গিক ভাবনা হইলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া কিংবা একই পর্যায়ে থাকায় কোন প্রভাব রাজস্ব আয়ের উপর পড়িতেছে কিনা। আমাদের রাজস্ব আয়ের অন্যতম খাত হইলো- মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায়। অর্থনৈতিক প্রবদ্ধি নামিয়া আসা মানে মূল্য সংযোজনেরও গতি কমিয়া যাওয়া। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যত মূল্য সংযোজন হয় একটি অর্থবত্সরে তাহার সমষ্টিই জিডিপি। ফলে মূল্য সংযোজনের সমষ্টি কমিয়া যাওয়া মানে প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া। সামষ্টিকভাবে মূল্য সংযোজনের প্রবৃদ্ধি কমিয়া গেলে মূল্য সংযোজন করের প্রবৃদ্ধিও কমিয়া যাইবে যদি করহারের কোন পরিবর্তন না হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে আমদানির প্রবৃদ্ধি কমিয়া গিয়াছে। আমদানির প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়ার মানে হইলো আমদানি পর্যায়ের শুল্ক আয়ের প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া। মোটকথা, অর্থবত্সরের প্রথমার্ধে রাজস্ব আদায়ের শ্লথ গতি যদি উপরোক্ত দুটি অর্থনৈতিক চলক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আমদানির প্রবৃদ্ধির সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়, তবে এনবিআর বত্সরের শেষার্ধেও লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছিতে ব্যর্থ হইবে। আর এই ধরনের ব্যর্থতাও আগামী অর্থবত্সরের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করিবে। মনে রাখিতে হইবে, রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি খুবই জোরালোভাবে নির্ভর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হইলে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধিও শ্লথ হইবে ইহাই স্বাভাবিক। ফলে অনুন্নয়ন বাজেটের অর্থায়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিটানোর জন্য রাজস্ব আয়ের ব্যাপ্তি বাড়াইতে হইবে। রাজস্ব আয় ও জিডিপির যে অনুপাত তাহাকে বাড়াইতে হইবে। করহার না বাড়াইয়া করের আওতা বৃদ্ধি এবং করের ফাঁকি কমাইয়া মোট রাজস্ব আয় বাড়াইবার চেষ্টা করিতে হইবে।