বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য অগ্রগতির এই যুগে মানুষের জীবন একদিকে যেমন সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হইয়া উঠিতেছে, অন্যদিকে তেমনি আবার সমাজে, পরিবারে ও ব্যক্তিগত জীবনে নানান সমস্যা-সংকটও ডাকিয়া আনিতেছে। যাযাবর তাহার বিখ্যাত ‘দৃষ্টিপাত’ উপন্যাসে একটি সত্য কথন উচ্চারণ করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন যে, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। মানুষ মাত্রেই আবেগনির্ভর প্রাণী। আবেগই মানুষের পথ চলার ক্ষেত্রে চালিকাশক্তিরূপে কাজ করে। ফলে আবেগ না থাকিলে মানুষকে আর মনুষ্য বলিয়া চিনিবার উপায় থাকে না। সুতরাং মানুষের যাহা কিছু সৃষ্টি ও অর্জন উহার পশ্চাতে আবেগের তাড়না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনও কখনও ঐ আবেগই জীবনকে সংকটময় করিয়া তোলে, যদি কিনা বুদ্ধির বাঁধ দ্বারা ঐ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা না যায়। বুদ্ধিমত্তা এবং স্থির মস্তিষ্কপ্রসূত কোন সৃষ্টি কিংবা চিন্তা কল্যাণ বহিয়া আনে আর অধৈর্য ও অস্থিরতা চিত্ত বিক্ষেপই সৃষ্টি করে কেবল! প্রযুক্তির এই উন্নতি আর বাজার অর্থনীতি গোটা বিশ্বকে এককভাবে আজ বদলাইয়া দিয়াছে, যাহা মানুষের নিকট কল্পনাতীত ছিল। জীবন এখন প্রচণ্ড বেগে সম্মুখপানে ধাইয়া চলে আর সেই তীব্র গতি অনেক সময় সবকিছুকে তছনছ করিয়া দিতে উদ্যত হয় বৈকি! আর সেইজন্যই প্রয়োজন এক ধরনের আত্মিক শক্তি আর বুদ্ধিনির্ভর আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়াস ও শিক্ষা। এইক্ষেত্রে সবচাইতে যাহা জরুরি উহা হইল পারিবারিক শিক্ষা। পরিবারের মধ্য হইতে যে সুশিক্ষার বীজ শৈশবে মানুষের জীবনে উপ্ত হইয়া তাহার ভবিষ্যত্ জীবনের দিক-নির্দেশনার সহায়ক হয় উহার চর্চা আজ সমাজে অনেকখানি হ্রাস পাইয়াছে। ফলে কিশোর বা শিশুরা বয়োপ্রাপ্তির পর বহুলাংশে দিশাহারা হইয়া অকারণে ও অপ্রয়োজনে এইদিক-সেইদিক ছুটোছুটি করিয়া অনেক ক্ষেত্রে জীবনকে অনিশ্চিত করিয়া তুলিতেছে। ইহা দুর্ভাগ্যজনক, তবে প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা মানুষের জীবনে এমন কিছু সত্গুণাবলী সঞ্চার করিতে পারে, যাহা জীবনে রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করিয়া থাকে। কিন্তু সত্য এই যে, ধর্মের সেই মূল ও প্রকৃত শিক্ষা আজ আর পরিবারে সেইভাবে চর্চিত হইতে দেখা যায় না।
হিন্দিতে প্রচারিত জাপানী কার্টুন ডোরেমন আমাদের শিশুদের নিকট যে আসক্তি সৃষ্টি করিতেছে উহা লইয়া অভিভাবকেরা তো বটেই, এমনকি দেশের আইন প্রণেতারাও উদ্বিগ্ন। আগেই বলিয়াছি, প্রযুক্তির উত্কর্ষের কল্যাণে ‘ডোরেমন’ জাতীয় কার্টুন শিশুমনে গভীর আকর্ষণ সৃষ্টি করিয়াছে। কার্টুন দেখা কোন দোষাবহ বিষয় নহে; কিন্তু ঐ কার্টুন যখন ভিন্ন ভাষায় অর্থাত্ হিন্দি ভাষায় ডাবিং করিয়া এই দেশে প্রচারিত হইতেছে তখন আমাদের শিশুরা মাতৃভাষা অপেক্ষা হিন্দি ভাষার প্রতি অধিক আগ্রহী হইয়া পড়িতেছে। শিশু-কিশোর বয়সে বর্তমানের এই ‘গ্লোবাল ভিলেজ’-এর যুগে চার/পাঁচটি ভাষার পারঙ্গমতা অর্জন ব্যক্তিজীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করিবার সহায়ক হইবে ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই। কিন্তু ‘ডোরেমন’ জাতীয় পরিবেশনা যখন মাতৃভাষা ভুলাইয়া দেওয়ার মতো অবস্থায় গিয়া পৌঁছায় তখনই শংকিত না হইয়া পারা যায় না নিশ্চয়ই। আর এই কারণেই অভিভাবক হইতে শুরু করিয়া সংশ্লিষ্ট সকলকে এই ব্যাপারে শংকা ও উদ্বেগ প্রকাশ করিতে দেখা যাইতেছে। ডিশ চ্যানেলের মাধ্যমে হিন্দি চ্যানেলে অষ্টপ্রহর যে ‘ডোরেমন’ কার্টুনটি পরিবেশিত হইয়া থাকে সেই ব্যাপারে গত রবিবার জাতীয় সংসদের সদস্য শাহরিয়ার আলম সংসদে অভিযোগ করিয়াছেন যে, এই কার্টুনটি আমাদের শিশুদেরকে হিন্দি আর মিথ্যা বলা ছাড়া কিছু শিখাইতে পারে না। তাহার এই অভিযোগটি অমূলক নহে। কিন্তু এই আধুনিক যুগে শিল্প-সংস্কৃতির কোন জানালা বন্ধ করিয়া দেওয়াও তো সম্ভব নহে। তাহা হইলে উপায় কি? উপায় এইক্ষেত্রে একটিই আছে, আর তাহা হইল পরিবারের মধ্য হইতেই শিশুমনে ভালো- মন্দের বোধ সৃষ্টি করা। এইজন্য অভিভাবকদেরও সজ্জন হইতে হইবে ও একই সঙ্গে নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাজাত্যবোধ সম্পর্কেও নিষ্ঠাবান থাকিতে হইবে। আর নিজ নিজ ধর্মের সদাচারসমূহ তাহাদের সন্তানদের কচি মনে প্রোথিত করিতেও উদ্যোগী হইতে হইবে।
