তাহরির স্কোয়ার আন্দোলনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতেও মিসরের রাজপথ ছিল উত্তাল ও প্রকম্পিত। সর্বশেষ এই গণজোয়ার দেখে বোঝা যায়, মিসরের গণঅভ্যুত্থান লাইনচ্যুত হয়েছে। এই ঘটনা আরব বসন্তের ব্যর্থতাকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে। এমনকি এখন কেউ কেউ পুরাতন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে নষ্টালজিয়ায় মগ্ন আছেন। অর্থাত্ তারা বোঝাতে চাচ্ছেন যে, আগের দিনগুলিই ভাল ছিল। সিরিয়ার দিকে চেয়ে দেখুন। হোসনি মোবারকের ন্যায় আরবের অন্যান্য স্বৈরশাসকরা ক্ষমতায় থাকাকালীন এতটা বিপাকের মধ্যে পড়েননি। গত দু’ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। তবে এভাবে ক্ষমতার পালাবদলের পর শুধু সংবিধান প্রণয়ণ ও নির্বাচন অনুষ্ঠানই যথেষ্ট নয়, দেশে ভাল নেতৃত্বও গড়ে তোলা দরকার।
মিসর ও জর্ডানের মধ্যে পার্থক্যগুলো তুলনা করুন। আরব অভ্যুত্থানের শুরুতে মিসরে স্বৈরশাসকের পতনের মধ্য দিয়ে জনগণের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটল। নতুনভাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু হল। পক্ষান্তরে জর্ডানে বদলে গেলেন কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। পরিস্থিতি উপলদ্ধি করে কিছু সংস্কারেরও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল। এরপর মিসর ভুলপথে চলা শুরু করল। আর জর্ডান বুদ্ধিমানের মতো ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করল।
মিসর সঠিকভাবে মুক্তির আগেই গণতন্ত্রায়নকে প্রাধান্য দিল। নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হল। নতুন সরকারের বৈধতায় এটা ব্যবহূত হল। মিসরের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় এল। প্রথমবারের ন্যায় একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। তিনি মুহাম্মদ মুরসি যিনি প্রথম দফা নির্বাচনে মাত্র ২৫ ভাগ ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হলেন। তিনি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সংবিধান প্রণয়ণ করলেন। কিন্তু সেই সংবিধানে দেখা গেল অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি। যেমন—নারীর অধিকার রক্ষায় এই সংবিধান ব্যর্থ হল। সাংবিধানিক পরিষদের ৪৫ জন সদস্যের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র চারজন। নারী অধিকারের বেলায় যে ভাষা প্রয়োগ করা হল, তা প্রাচীন মিসরের পারিবারিক প্রথাকেই সংস্থাপন করল। এই সংবিধান ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে ফেলল। যেমন- বাহাই সম্প্রদায় জুলুম-নির্যাতনের শিকার হল। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে মিডিয়া সেন্সরশিপেরও অনুমোদন দেয়া হল। এসব প্রক্রিয়ায় সরকারকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হল যা ক্ষমতাসীন মুসলিম ব্রাদারহুড ব্যবহার করতেও শুরু করল। মাত্র ছয় মাসের শাসনামলে মুহাম্মদ মুরসির সমালোচনা করায় অনেক সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা হল। মোবারকের প্রায় ৩০ বছরের শাসনামলেও এত সাংবাদিক নিগৃহীত হননি। নিজের ক্ষমতা বাড়াতে গত নভেম্বর মাসে মুরসি এক ডিক্রি জারি করেন যা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে।
অন্যদিকে জর্ডানে রাজা নির্বাচন অনুষ্ঠানে তড়িঘড়ি করলেন না। যদিও এই নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হল। তিনি এর পরিবর্তে সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে একটি সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করলেন। এই পরিষদের সদস্যরা জর্ডান ও পশ্চিমা বিশ্বের অনেক বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করলেন। ফলে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সংবিধান সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হল। পরিষদ রাজার কিছু ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতে ন্যস্ত করার ব্যবস্থা করল। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা পেল। তারপর একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। কিন্তু জর্ডানের প্রভাবশালী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুড এই পরিবর্তনকে নগণ্য মনে করল। তারা অভিযোগ তুলল যে, মূল ক্ষমতা এখনও রাজার কাছে রয়ে গেছে। এজন্য তারা নির্বাচনও বয়কট করল। তবে নির্বাচন কমিশনের সফলতা এই যে, তারা দেশের ৭০ ভাগ উপযুক্ত ভোটারকে নিবন্ধিত করল। তন্মধ্যে ৫৬ ভাগ নির্বাচনে ভোট দিল। আরব বিশ্বে এখন পর্যন্ত ভোট দেওয়ার এই হারই বেশি। রাজা ও সরকারের অনেক সমালোচকও এতে নির্বাচিত হলেন। তন্মধ্যে ১২ ভাগ আসনে জিতলেন বিরোধী ইসলামি পার্টির লোকজন। কোটা থাকার কারণে নির্বাচনে ১২ ভাগ নারী সদস্য নির্বাচিত হলেন। কোটা রাখার জন্য ধন্যবাদ নির্বাচন কমিশনকে। রাজা আব্দুল্লাহ দ্বিতীয় এখনও নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী। তবে নতুন পদ্ধতির কারণে জর্ডান সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে গেছে।
জর্ডানের মতো মরক্কোও একই পথ অনুসরণ করেছে। ২০১১ সালে দেশটির সংবিধান সংস্কার করা হয়। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত হয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে ইসলামি পার্টি ৩৯৫টি আসনের মধ্যে ১০৭টিতে জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে। এই সরকারের প্রধান আব্দুল্লাহ বিন কিরানি। যদিও তিনি পশ্চিমা বিশ্বের সমালোচক, তথাপি তিনি সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার কথা বলে আসছেন দৃঢ়ভাবে। যেমন- তিনি বলেছেন যে, মরক্কোর ইহুদিরা শতাব্দির পর শতাব্দি এখানে বসবাস করছেন। তারা দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরব বিশ্বের দুটি দেশে তুলনামূলকভাবে গণতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বেশি হয়েছে। দেশ দুটি হল ইরাক ও মিসর। কিন্তু ফলাফল দুঃখজনক। উভয় দেশে সংবিধান প্রণয়নের আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং পরিণাম শুভ হয়নি। কেননা ব্যক্তি অধিকার নিশ্চিত না করেই মানুষ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। উভয় দেশের প্রথম নির্বাচিত নেতাই শক্তিশালী ও ইসলামি পার্টির। কিন্তু তারা উভয়ই উদার গণতন্ত্রের প্রতি নিবেদিত নন। ফলে অনুদার গণতান্ত্রিক দেশ ইরাকে অস্থিরতার অবসান হয়নি। একই ঘটনা ঘটছে মিসরেও। তাই আরব বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হতে পারে জর্ডান ও মরক্কো। তারা অভূত্থানের বদলে অভিব্যক্তিবাদ বা বিবর্ধনকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। ক্রমবিকাশের এই নীতি তুলনামূলকভাবে ভাল।
দি ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর : ফাইজুল ইসলাম
++লেখক : সম্পাদক, নিউজউইক ইন্টারন্যাশনাল
