ব্যাংক ব্যবস্থায় ঋণ ও মুনাফা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামপ্রতিক এক রিপোর্টে ব্যাংক ব্যবস্থায় গত এক বত্সরে খেলাপি ঋণ অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়া যাওয়ার চিত্র উঠিয়া আসিয়াছে। আমানতকারীর টাকায় ঋণ প্রদান করিয়া সেই ঋণের উপার্জিত অর্থ দিয়া আমানতকারীকে সুবিধা দিয়া মুনাফার দ্বারা ব্যাংক ব্যবস্থা চলে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত এবং বিনিয়োগের ঝুঁকির কারণে কিছু ঋণ খেলাপি হওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু হঠাত্ করিয়া খেলাপি ঋণের পরিমাণে উল্ল¬ম্ফন কোন একটি বত্সরে মোটেও ভাল কথা নয়। ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে ঋণের মোট পরিমাণ বত্সর বত্সর বাড়িতেছে। ফলে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ বত্সর বত্সর বাড়িয়া যাওয়া মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। কিন্তু গত বত্সর তাহার আগের বত্সরের তুলনায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ গতানুগতিক বাড়িবার চাইতেও অনেক বেশি বাড়াটা উদ্বেগের বিষয়। হঠাত্ করিয়া খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়া যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করিয়া তাহা নিয়ন্ত্রণে রাখিবার ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। ব্যাংকাররা বলিতেছেন, শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা তৈরি হওয়ার দরুন এই খেলাপি ঋণের অংক বাড়িয়াছে। যেমন- রিয়েল এস্টেট খাত, জাহাজ ভাঙা শিল্প, আমদানি অর্থায়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রদেয় ঋণ আদায় হইতেছে না। কিন্তু সবসময়ই অর্থনীতির কোন না কোন খাতে ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হইয়া পড়ে। তাহার জন্য কোন এক বত্সরে হঠাত্ খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন হওয়ার কথা নয়। বরং হলমার্ক-এর মত বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনার কারণে এই উল্লম্ফন হইয়া থাকিতে পারে। প্রশ্ন হইলো, প্রাইভেট ব্যাংকের ক্ষেত্রেও আমরা যখন খোলাপি ঋণের পরিমাণের হঠাত্ উল্লম্ফন দেখি তখন সমগ্র ব্যাংক ব্যবস্থার মধ্যেই কোন গলদ রহিয়াছে বলিয়া অনুমান করিতে হয়। তবে গত কয়েক বত্সর ধরিয়া প্রাইভেট ক্রেডিট-এর ক্ষেত্রে যে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গিয়াছে তাহার একটা প্রভাব পড়িয়া থাকিতে পারে এই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। যখন প্রাইভেট খাতে ঋণের পরিমাণ অনেক বাড়িয়া যায়-সমপ্রসারণমূলক মুদ্রানীতির কারণে তখন অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ প্রদানের সময় ঋণের ঝুঁকির দিকগুলি সঠিকভাবে বিচার-বিবেচনা করা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের জনৈক ডেপুটি গভর্নর, যিনি ব্যাংকের এই বিষয়গুলি দেখভাল করেন, তিনি কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদানের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিতেছেন খেলাপি ঋণ বাড়িবার কারণ হিসাবে। সেই ক্ষেত্রে ঋণ প্রদানের মানদণ্ড মানিয়া চলিতে ব্যাংকগুলিকে বাধ্য করিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, এই খেলাপি ঋণের কারণে আমাদের ব্যাংক ব্যবস্থা হইতে কার্যকর বিনিয়োগের যে প্রবৃদ্ধি তাহা কিন্তু বাধাগ্রস্ত কিংবা শ্লথ হইয়া যাইবে। সমপ্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত ও বিনিয়োগের সুদের হারের যে ব্যবধান তাহা ৫ শতাংশের মধ্যে নামাইয়া আনিতে ব্যাংকগুলিকে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করিয়া দিয়াছে। যেহেতু খেলাপি ঋণ ব্যাংকের জন্যে এক ধরনের ব্যয়, খেলাপি ঋণ যত বাড়িবে, এই ব্যয়ও তত বাড়িবে। ব্যাংকের যে কোন ব্যয় বাড়িলে তাহার আমানতের সুদের হার ও বিনিয়োগের সুদের হারের মধ্যে যে ফারাক তাহাও বাড়িবে। তাহার মানে এই খেলাপি ঋণের উচ্চ সুদের হারের মাধ্যমে বিনিয়োগ চাহিদাকে কমাইয়া দিয়া কার্যকর বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমাইয়া ফেলিবে। আর বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া মানে হইলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়া যাওয়া, যাহা আমাদের প্রত্যাশিত নয় একেবারেই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন