মৃিশল্পের সংকট ও সম্ভাবনা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৭
নওগাঁর রানিনগরের একদা সুনাম ছিল মৃত্ শিল্পের জন্য। এই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ছিল কুমার বাড়ি। মাটি দিয়া তাহারা তৈয়ার করিতেন বহু বিচিত্র বাসন-কোসন। তাহারা বানাইতেন কারু-কার্যময় মাটির পুতুল, খেলনা পাখি, আরও কত কী! আর এই ছিল তাহাদের জীবন জীবিকার অবলম্বন। যাহারা তৈয়ার করিতেন, তাহারাই পল্লী জনপদে ফেরি করিতেন সেইসব জিনিস। চাহিদাও ছিল প্রচুর। গৃহস্থ বাড়িতে মাটির হাড়ি-পাতিলের ব্যবহারও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু সেই দিন গত হইয়াছে অনেক আগেই। এইকালে মাটির বাসন-কোসনের চাহিদা নাই বলিলেই চলে। মাটির পুতুল এইকালের শিশুদের মনে ধরে না। এমতাবস্থায় মৃত্ শিল্পীরা ভাল নাই। ভাল থাকিতে পারেন না। রানিনগরের কুমোরদের অনেকেই পৈতৃক পেশা ছাড়িয়া লাগিয়া গিয়াছেন অন্য কোনো কাজে। যাহারা সেই সুযোগ করিয়া লইতে পারেন নাই, তাহারই কেবল আঁকড়াইয়া ধরিয়া পড়িয়া আছেন পূর্ব পুরুষের পেশা। এই পেশার অস্তিত্ব আজ নিপতিত হইয়াছে নিদারুণ এক সংকটের মুখে। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে দৈনিক ইত্তেফাকে। কেবল রানিনগর বলিয়া কথা নহে, বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই কুমার সমপ্রদায় ছিলেন। তাহাদের অস্তিত্বের সংকট সবখানেই। গার্হস্থ্য কাজে মৃত্পাত্র ব্যবহার করিবার চল উঠিয়া গেলেও মৃত্ শিল্প ইতোমধ্যে লাভ করিয়াছে নূতন মাত্রা। অতীতের হাড়িপাতিল এইকালে আসিয়া আরও সৌকর্যময় হইয়া উঠিয়াছে। সৌখিন মানুষের ঘরে এইগুলি শো-পিস হিসাবে ব্যবহূত হইতেছে। ঢাকায় এখন নানান নকশা করা মৃত্পাত্র বিক্রয় হইয়া থাকে দেদার। কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্রও অতীতে গৃহকর্মে ব্যবহূত হইত। কিন্তু সেইসবও এখন শোভা পায় রুচিশীল মানুষের ঘরের দেওয়ালে ও শো-কেসে। মাটির কিংবা কাঁসা-পিতলের জিনিসে নান্দনিকতার ছাপ সব সময়ই ছিল কম-বেশি। বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সাথে মিশিয়া আছে মৃিশল্প। এই ঐতিহ্য প্রায় পৌনে চার হাজার বত্সরের। আনুমানিক ১৫ শত খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই অঞ্চলে বিকাশ ঘটে মৃিশল্পের। নদীমাতৃক বাংলা অঞ্চলের এঁটেল মাটি মৃত্পাত্র তৈয়ার করিবার উপযোগীও বটে। বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে অদ্যাবধি যত প্রত্নকেন্দ্র আবিষ্কৃত হইয়াছে, সর্বত্রই পাওয়া গিয়াছে বহু বিচিত্র নান্দনিক মৃত্পাত্র। সেইগুলি বাঙ্গালির ঐতিহ্যের স্মারক, অনন্যসাধারণ প্রত্ননিদর্শন। পশ্চিমবঙ্গের পান্ডুরাজার ঢিবি, ভরতপুর, মঙ্গলকোট, চন্দ্রকেতুগড় প্রভৃতি প্রত্নকেন্দ্র, আর এইদিকে বাংলাদেশের মহাস্থানগড়, ভাসুবিহার, ওয়ারি-বটেশ্বর, ময়নামতি ও পাহাড়পুরসহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে মাটির তৈয়ারি অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া গিয়াছে। সেই ধারারই যেন বা পুনরুজ্জীবন ঘটিবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে নূতন করিয়া, যদিও প্রান্তিক কারিগরদের পেশায় টিকিয়া থাকা দুরূহ হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের সামনে লইয়া আসিতে হইবে। গ্রাম-গ্রামান্তরের কুমারদের যদি সামান্য প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহা হইলে তাহারাও তৈয়ার করিতে পারিবেন আধুনিক সৌকর্যমণ্ডিত মৃত্পাত্র, যাহা সহজেই আকৃষ্ট করিতে পারে দেশ ও বিদেশের সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষের মন। বিদেশেও এই সামগ্রির বাজার সৃষ্টি করা যাইতে পারে , যদি সেইভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়। মৃত্ শিল্পীদেরও তখন আর পৈতৃক পেশা হইতে উচ্ছেদ হইয়া যাইবার কোনো কারণ থাকিবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন