বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালে জাগ্রত তারুণ্যের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার শাহবাগের চৌরাস্তার মহাসমাবেশস্থল থেকে সারা বাংলাদেশে। যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক। এ বিচার মানছে না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিপ্লবী তারুণ্য। যারা একাত্তরের বর্বর হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা দেখেনি তারা এবার জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব দেখেছে মারমুখী পুলিশের উপর নির্মম আক্রমণ, ভাংচুর, অতর্কিত হামলার মাধ্যমে। রাজনীতিবিদরা যখন ব্যর্থ হয় তখন তারুণ্যের প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটে জাতীয়ভাবে। এভাবে জাতি রক্ষা পেয়ে যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রক্ত দিয়েছিল তরুণরা মাতৃভাষা রক্ষার্থে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা এনেছে এবং বিজয় হয়েছে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করেছে এবং স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে। তাদের উত্তাল আন্দোলন এখন দেশব্যাপী জনগণের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছে। অপ্রতিরোধ্য এ চেতনার বিজয় সময়ের ব্যাপার মাত্র। সব যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসির দাবিতে এবং তারুণ্যের প্রতিবাদে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে শাহবাগ স্কোয়ার। তারা সমস্বরে দাবি করছে: সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তাদের কণ্ঠে উদ্ধৃত হচ্ছে অমর একুশের কালজয়ী পংক্তিমালা: ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। এ শ্ল্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে উপস্থিত জনতার মুখে মুখে। শাহবাগ স্কোয়ারের চৌরাস্তা থেকে শিশুমেলা, কাঁটাবন, টিএসসি চত্বর এবং রূপসী বাংলা মোড় পর্যন্ত তরুণরা দিনরাত সমবেত হয়ে উত্তাল করে তুলেছে মহাসমাবেশটি। তাদের আন্দোলন তত্পরতা সরাসরি বিভিন্ন চ্যানেলে দেখানো হচ্ছে। এ আন্দোলনে বিজয়ী না হয়ে তারা ঘরে ফিরবেন না। লাখো জনতার অংশগ্রহণের ফলে শাহবাগ এলাকা পরিণত হয়েছে জনসমুদ্রে।
দেশজুড়ে এ প্রতিবাদের সমর্থনে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। শাহবাগ চত্বর থেকে নতুন করে দেশ রক্ষার ডাক দিচ্ছে তরুণরা। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষের বিপ্লবী শ্লোগানে প্রকম্পিত হচ্ছে রাজপথ। রাজধানীবাসীর আন্দোলনের ঠিকানা হয়ে উঠেছে শাহবাগ চৌরাস্তা। মুক্তিযোদ্ধা, কিশোরী, ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে অবুঝ শিশুও অংশ নিচ্ছে নতুন প্রজন্মের বাঁধভাঙ্গা জনসমুদ্রে। বিপ্লবী তারুণ্যের ও গণজাগরণের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র। পায়ে হেঁটে মানুষ যাচ্ছে এখন ‘শাহবাগ স্কোয়ার’-এর দিকে। ’৭১-এর ঘাতক কাদের মোল্লার ফাঁসি না হওয়ায় বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন মুক্তিযোদ্ধাসহ মিরপুরের আলোকদী গ্রামের অনেকে। গৃহিণীরা আসছেন রাতজাগা ও শ্লোগান মুখরিত সন্তানদের জন্য রান্না করা খাবার নিয়ে। শহীদ মিনার তৈরি করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন অনেকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন পালন করেছে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ।
তাদের সঙ্গে সংহতি জানাতে আসছেন সর্বস্তরের মানুষ। জনসমুদ্রের অসংখ্য ব্যানার আর রাজপথের আল্পনায় পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে সভামঞ্চের প্রাঙ্গণ। ছাত্র-ছাত্রী, সাংস্কৃতিককর্মী ও প্রতিবাদী মানুষের অবস্থানের মাধ্যমে রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা ফুটে উঠেছে। উপস্থিত আন্দোলনকর্মীরা আগুন দিচ্ছে রাজাকারদের কুশপুত্তলিকায়। তারা থুতু দিচ্ছে আর জুতো ছুঁড়ে ধিক্কার জানাচ্ছে রাজাকারদের ঘৃণাস্তম্ভে। প্রজেক্টরে দেখানো হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। অসংখ্য প্রতিবাদী শ্লোগান, গান আর কবিতা উচ্চারিত হচ্ছে মাইকে। ঢাক- ঢোল, করতালসহ নানা সরঞ্জামের বাদ্যবাজনার তালে তালে চলছে কাদের মোল্লার রায়ের প্রতিবাদ। চারুকলার শিক্ষার্থীরা রাস্তায় এঁকে যাচ্ছেন রাজাকারদের ব্যঙ্গচিত্র। সমস্বরে দাবি জানানো হচ্ছে : ‘ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ কর, সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ রাতব্যাপী ঢাকায় হাজারো মানুষ মশাল হাতে বিক্ষোভ করেছে। সন্ধ্যার পর শাহবাগের পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিপূর্ণ হয়েছে। মোমের প্রদীপের আলোতে অন্ধকার ও কালিমা দূর করার শপথ নিয়েছেন আন্দোলনরতরা। শুক্রবার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয়েছে মহাসমাবেশ। এ মহাসমাবেশে ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সেবা সংস্থাগুলো স্বেচ্ছায় সেবা দিতে এগিয়ে এসেছে। শুকনো খাবার ও পানি বিতরণ করছেন। এ যেন ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। ’৭১-এর ঘাতক ও জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে বৃহস্পতিবার রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল, কুমিল্লা, মুন্সীগজ্ঞ, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, রংপুর, সুনামগঞ্জ, বান্দরবান, মাগুরা, দোহার, নবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, খাগড়াছড়ি, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, নরসিংদী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, নড়াইল, মানিকগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নেত্রকোনা, শাবি, ঝিনাইদহ, বাগেরহাটসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় অবস্থান কর্মসূচি, মানববন্ধন, বিক্ষাভ-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে সাভারে। বাস্তবতা হলো, কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন শহর থেকে গ্রাম; টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ আজ বিপ্লবী শ্লোগানে মুখরিত। সপক্ষের দেশপ্রেমিক মানুষ শাহবাগে গিয়ে বিপ্লবীদের সবাইকে মিছিল আর শ্লোগানে উজ্জীবিত হওয়ার জন্য প্রেরণা দিচ্ছেন। এ যুদ্ধে পরাজয়ের কোন সুযোগ নেই। আন্দোলনকারীদের বিজয় অনিবার্য। তাদের কণ্ঠে ক্রমাগত ধ্বনিত হলো: জয়বাংলা/ জয় বাংলাদেশ/বীর বাঙালির হাতিয়ার-গর্জে উঠুক আরেকবার /দালালদের আস্তানা-আপোষের আস্তানা-সমঝোতার আস্তানা ভেঙ্গে দাও গুঁড়িয়ে দাও/সামপ্রদায়িকতার আস্তানা-রাজাকারের আস্তানা-ইত্যাদি শ্লোগানে উত্তাল ও মুখরিত শাহবাগ চৌরাস্তা। তারা চায় প্রয়োজনে কাদের মোল্লাকে খুন করে জেলে যেতে। তাদের ভাষ্য হলো :‘৩৫৫টি খুন ও ধর্ষণ মামলায় যদি ১৪ বছর করে জেল হয় তাহলে একটি খুনের মামলায় হয় প্রায় দুই মাস করে জেল। তাহলে আমরা কাদের মোল্লাকে খুন করে দুই মাস জেলে থাকতে চাই।’ তরুণ-তরুণীরা নিজের লেখা ব্যানার-ফেস্টুন হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, দিতে হবে দিয়ে দাও’ শ্লোগানে মুখর হয়েছে। এ গণআন্দোলনে নামার পর প্রতিবাদে-প্রতিরোধে জ্বলে ওঠার আগুন ঝরছে সবার চোখে মুখে। অনেকেই নিজের মত করে প্রতিবাদী মন্তব্য লিখেছেন; কিন্তু সেইসব মন্তব্যে রাজপথ পরিপূর্ণ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান চলছে। সেই লক্ষ্যে কাপড়ের ওপর রাখা হয়েছে কলমও। কে আগে মন্তব্য লিখবেন তা নিয়েও দীর্ঘ লাইন। সংক্ষেপে মন্তব্য লেখার তত্পরতা চলছে। মানবিক আকুতিতে ও ভারাক্রান্ত মন্তব্যে ভরে গেছে কাপড়। সেই কাপড়ে বিপ্লবী মানুষের একটাই দাবি: রাজাকারদের ফাঁসি চাই। কোন আপোষ চলবে না। রাজাকারদের রক্ষায় যারা সহযোগিতা করবে কিংবা আপোষের চেষ্টা চালাবে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে যুব সমাজ। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা শুরু করেছে। সংহতি প্রকাশ করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের বিভিন্ন সংগঠন। স্বাধীনতাবিরোধীরা ’৭১-এর পরে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র এবং সরকারের বিরুদ্ধে সরকার গড়ে তুলেছে। তারা দেশকে জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদের রাষ্ট্র বানাতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণ প্রজন্ম যে গণজাগরণ গড়ে তুলেছে তার বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরচক্রও আঘাত হানতে ষড়যন্ত্র করছে। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তত্পর রয়েছে এব্যাপারে। এ আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে রয়েছে শৃঙ্খলা। রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদী মঞ্চে ঘেঁষতে পারছেন না। কারণ যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি জাতীয় দাবি। এটি কোন দলীয় দাবি নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার বিপরীতে অরাজনৈতিক তরুণরা প্রতিবাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। বিজয় তাদের অনিবার্য। তবে তাদের সঙ্গে সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিক্যাল শিক্ষার্থীসহ আরও অনেকে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণ প্রজন্ম যে আন্দোলন শুরু করেছে তার প্রতি দেশবাসীর সমর্থন রয়েছে। তাই আন্দোলনের বিজয় অনিবার্য। শুধু দেশে নয়, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশ হতে বিশ্বব্যাপী। ফেসবুক, টুইটার প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত প্রতিবাদের মাধ্যমে দাবি আদায়ের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আরব দুনিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমেই স্বৈরশাসকদের ভিত কেঁপে উঠেছিল। কাউকে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম আজ প্রযুক্তির মাধ্যমে গোটা জাতিকে জাগিয়ে তুলেছে। এ জেগে ওঠা আগুনের লেলিহান শিখা ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের শহরে-বন্দরে-গ্রামে। তরুণ প্রজন্ম ফেসবুক, টুইটার আর ব্লগের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তুলেছে শাহবাগ চৌরাস্তার বিজয়মঞ্চ ও প্রতিবাদ কেন্দ্র। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বিবেকের তাগিদে বিগত চারদিন ধরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। ‘ব্লগার এ্যান্ড এ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক’ নামের ফেসবুককেন্দ্রিক দলটি টানা প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। সারাদেশের তরুণ সমাজ প্রতিবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। বিবেকের তাগিদে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে অংশ নিচ্ছে সাধারণ মানুষসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। ২০১৩ সালে জনগণ এখন ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় প্রতিবাদী চেতনায় আরেকটি বিজয়ের অপেক্ষায় আন্দোলনরত।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক [email protected]
