মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও বিজয় হচ্ছে আমাদের গর্ব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের লড়াই ছিল আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও স্বাধীনতার লড়াই, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে যে বীররা ৭১ এ পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ও নির্দ্বিধায় তাদের অমূল্য প্রাণ উত্সর্গ করেছিল- সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছিল আমাদের পরম স্বাধীনতা, পৃথিবীর মানচিত্রে ঠাঁই পেয়েছিল আজকের এই সোনার বাংলাদেশ। আমরা পেয়েছিলাম অপূর্ব সৌন্দর্যের লাল সবুজের মিশ্রণের স্বাধীনতার এক গৌরবময় পতাকা। সেই বিজয় পতাকা ছিনিয়ে আনতে শহীদ হয়েছিল ৩০ লাখ আত্মত্যাগী মানুষ। হারিয়েছিল লাখো মা ও বোন তাদের সম্ভ্রম। ইতিহাসের সেই কলঙ্কজনক, অমানবিক ও পাশবিক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও ধ্বংসলীলার তাণ্ডব যারা সেদিন চালিয়েছিল, তারা তো ছিল অতি পরিচিত খাকি পোশাক পরিহিত পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও পূর্ব বাংলায় তাদের দোসর- ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করা- জামায়াতে ইসলামী। ৪১ বছর পরে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ আজ ফুঁসে উঠেছে সেই ঘাতকদের বিচারকে ঘিরে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তারা আজ রাস্তায় নেমে পড়েছে, জমায়েত হয়েছে শাহবাগ চত্বরে- প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশ করতে। এক ছটাক ছাড় দিতে চায় না তারা আজ। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত অন্য সব রাজাকার ও আল-বদরদের অপেক্ষমান বিচারের রায় যেন আর “গুরু পাপে লঘু দণ্ড” না হয়- তার নিশ্চয়তাও চায় তারা। ৭১-এর মানবতার বিরুদ্ধের সব হিসাব নিকাশ তাই ২০১৩ এসে খানিকটা হলেও কড়ায় গণ্ডায় আদায় করার পালা এসে দাঁড়িয়েছে। বিচার নিয়ে কোনো প্রহসন দেখতে চায় না নিউ জেনারেশন। কোনো গোপন আঁতাতও নয়। তাই নিউ জেনারেশন শাহবাগ চত্বরে এসে ফুঁসে উঠেছে। তারা না বিএনপি না আওয়ামী লীগ। তারা নিতান্তই সাধারণ প্রতিবাদী, ৭১ এর চেতনার মানব ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এরা ভাংচুরে বিশ্বাসী নয়, তবে শান্তিতে। এরা খাটি দেশ প্রেমিক, স্বাধীনতার চেতনাকে ধরে রাখার পক্ষ, এরা নতুন জাগরণ। এরা ছড়িয়ে দিতে চায় তাদের কণ্ঠস্বর সাড়া বাংলাদেশে-সাড়া দুনিয়ায়। এরা গণআন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের মিডিয়া ও টিভি চ্যানেলগুলো তাই প্রতিনিয়ত তুলে ধরছেন এই নব জাগরণকারীদের কণ্ঠস্বর- বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছেন তারা তাদের অকৃত্রিম আবেগ ও আলোড়নকে। ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই ই চাই। একটু পিছনে ফিরে তাকানো যাক। যারা ১৯৭১ এ বাংলাদেশের জন্মই চায়নি, বাংলাদেশের উত্পত্তির সঙ্গেই যাদের বিরোধিতা- তারা কিভাবে জেঁকে বসলো বাংলাদেশের মাটিতে? কিভাবে রাজনীতিতে ঠাই হল তাদের? ১/১১ এর দুই বছরে মইনউদ্দিন ও ফখরুদ্দীন শাসন আমলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেত্রীদ্বয়সহ একাধিক নেতার জেল জরিমানা হলেও জামায়াতের নেতারা বেশ বহাল তবিয়তেই থেকে যায়। এসবের পরেও জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে তাঁদের জোট অক্ষুণ্ন রেখে চলতে সক্ষম হয় এবং ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জোট বেঁধে অংশ নেয়। বিএনপি ও জামায়াত জোটের তাতে ভরাডুবিই হয়। জামায়াতে ইসলামী মাত্র দুটি আসনে জয়লাভ করে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সেই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসীন হয়। এইভাবেই জামায়াত ইসলামী বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আজ অবধি অবাধে পরিচালনা করে আসছে। আজ তাদের নেতাদের বিচারের জন্য শেষতক মানুষ রাস্তায় এসে নেমেছে। শাহবাগ চত্বর হয়েছে জনসমুদ্র।
একচল্লিশ বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করেছে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য। কিন্তু কে করবে তাদের বিচার? জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে যেভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, জোট বেঁধেছে, কৌশলের রাজনীতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সঙ্গে আন্দোলনে শরীক হয়েছে- তাতে তাদের বিচার কিভাবে হবে? তাই দেখা যায় যে, ৭৫ পরবর্তী কোনো সরকারের আমলেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক কোনো বাধার সম্মুখীন হতে দেখা যায়নি। বরং তারা অবাধে রাজনীতি করেছে। মাঝখানে ৯০-এর দশকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মাধ্যমে জনতার আদালতে জামায়াতের কিছু নেতার প্রতীকী বিচার হলেও তা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় নয়। দেরিতে হলেও এবার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ শুরু করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের ঘাতকের মামলার রায়ও ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। অন্য রায়গুলোও অপেক্ষার পালা। রায় শোনা ও দেখার জন্য বাংলাদেশের মানুষ দেশে-বিদেশে আগুন্মুখ হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যেমন হয়েছে, হত্যাকারীদের ফাঁসি যেভাবে কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি তাই আজ গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। শাহবাগ চত্বরের গণদাবিই যেন বেঁচে থাকে। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি যেন নিশ্চিত হয়। ৭১ এর লাখো শহীদের আত্মা শান্তি পাক। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে নিষ্কলুষ রাজনীতির চর্চা শুরু হোক।—এই প্রত্যাশা রইল।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত। alamrowshon¦gmail.com
