আমাদের সমাজে যেইরূপে নিত্য-নূতন ‘কালচার’-এর উদ্ভব ঘটিতে দেখা যায় উহা বোধ করি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের নিকট কল্পনারও অতীত। রাজনীতিতে এবং অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেই এই নব নব ‘কালচারের’ আশ্চর্য উন্মেষ ও উদ্ভাবন দেখা যায়। এইরূপ উদ্ভাবনী শক্তির দিক দিয়া সম্ভবত আমাদের দেশ সবচাইতে আগাইয়া রহিয়াছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির দিকে একটু গভীর অভিনিবেশের সহিত তাকাইলেই আমরা এই জাতীয় অদ্ভুত সংস্কৃতির বিকাশ দেখিতে পাইব। খবরে প্রকাশ, বৃহত্তর যশোরের কেশবপুরস্থ কোমরপোল আইডিয়াল কলেজের ছাত্ররা অধ্যক্ষের অপসারণের দাবিতে কলেজটিতে তালা ঝুলাইয়া দিয়াছে। অর্থাত্ কলেজ কক্ষে তালা দিয়া উহা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। ইহা আইডিয়াল কলেজের ‘আইডিয়াল’ ছাত্রগণের উপযুক্ত কাজই বটে! এই আদর্শবাদী ছাত্ররাই একদিন দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করিবে সেই কথা মনে রাখিয়া এই অধ্যক্ষ অপসারণের উদ্দেশ্যে গৃহীত তাহাদের পদক্ষেপটিকে বিশ্লেষণ করিলে যে কাহারও মন হতাশায় ভরিয়া যাইবে বৈ কি! অধ্যক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের তথা তাহাকে অপসারণের জন্য এই জাতীয় ব্যবস্থা বা উদ্যোগ বর্তমানে এক নূতন কালচারের রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে। অবিশ্যি, অধ্যক্ষ নিয়োগের যে পদ্ধতি রহিয়াছে সেইক্ষেত্রেও অনেক সময় দলবাজি বা নিয়োগদাতা কর্তৃপক্ষের বা অধ্যক্ষের উপর প্রভাব বিস্তারপূর্বক নানান হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসিকতা ইত্যাদি প্রবলতর হওয়ার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ছাত্ররা যে অনেকক্ষেত্রেই এইভাবে ‘ইটের বদলে পাটকেল’ নিক্ষেপ করিতে বাধ্য হয় ইহাও মিথ্যা নহে। তবে ছাত্রদেরকে ব্যবহার করিয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহিত যুক্ত কোন কোন ব্যক্তি বা কোন কোন মহলও ফায়দা লুটিতে তত্পর থাকায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, ভিসি বা কোন বিভাগীয় প্রধানকে অপসারণের এই অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করিতে দেখা যায়।
আমরা বিগত বছরগুলিতে দেশে-বিদেশে স্বনামধন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে ভিসি বা অধ্যক্ষের অপসারণের দাবিতে ছাত্র এবং অনেকক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও এই জাতীয় ন্যক্কারজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে দেখিয়াছি। বিদ্যাপীঠে দলবাজি এবং সেই দলভুক্তদের মনতুষ্টির নিমিত্তে ও নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে শিক্ষার্থীদের জীবনকে বলি দিতে অনেক শিক্ষক এখন আর কোন প্রকার কার্পণ্য করেন না, চক্ষু লজ্জায় তো ভোগেনই না। ইহার ফলাফল কখনই ভাল হইতে পারে না। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিকল্পে মানুষ গড়ার কারিগররাও যদি নীতি-আদর্শ এবং ব্রত হইতে বিচ্যুত হন তাহা হইলে সমাজ গোল্লায় যাইবার আশংকা থাকিয়া যায় নিশ্চয়ই! শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকদের মাঝে রাজনৈতিক দলের তল্পিবাহক বনিবার মনোবাঞ্ছা যেমন প্রকট রূপ ধারণ করিতেছে উহাতে সংশয় না মানিয়া পারা যায় কি?
অন্যদিকে, আবার শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বার্থসিদ্ধির ঘুঁটিরূপে ব্যবহূত হইবার মধ্যেই যেন অধিক স্ফূর্তি লাভ করিয়া থাকে। তাই অধ্যক্ষ বা ভিসি নিয়োগে বা তাহাকে বদলি বা অপসারণের ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক যেসব বিধিবিধান রহিয়াছে উহাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া তাহারা তথাকথিত আন্দোলনে শামিল হয়। কিন্তু ইহাতে আখেরে যে তাহাদেরকেই পস্তাইতে হয় এই সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনাটুকুও তাহাদের স্বার্থের ঠুলি আঁটা চোখে ধরা পড়ে না তখন। সময়মতো শিক্ষাজীবন শেষ করিতে না পারিলে চাকুরী-বাকুরী বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে ধরনের বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন তাহাদেরকে হইতে হয় উহা যে তাহার নিজের ও তাহার পরিবারের জন্য কত বড় ক্ষতি ইহা বুঝিবার মতো বোধশক্তিও লুপ্ত হইয়া যায়। আর স্বল্পকিছু ছাত্রের এই অপরিণামদর্শী কাণ্ড-কারখানার খেসারত দিতে হয় অগণিত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে—যাহাদের অধিকাংশ কিনা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের সন্তান। এই অধ্যক্ষ বা ভিসি অপসারণের কালচার পরিহারের মানসিকতা জোরদার করার মধ্যেই তাহাদের ভালাই নিহিত উহা তাহাদেরকে বুঝিতে হইবে।
