সম্প্রতি তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে প্রজন্ম চত্বর শাহবাগে তিনদিন টানা অবস্থান কর্মসূচির পর এক সফল মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশের মূল প্রতিপাদ্য ছিল যুদ্ধাপরাধীদের ‘প্রকৃত বিচার’: এক কথায় ‘ফাঁসি’। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম আদেশ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করলেও দ্বিতীয় আদেশ পুরো জাতিকে হতাশ করেছে।
ক্ষমতার মোহে অন্ধ আমাদের রাজনৈতিক নেতারা রাজাকার-আলবদর-জামায়াতীদের সাথে বহুবার আঁতাত করে কলঙ্কিত করেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। এক্ষেত্রে বিএনপি-আওয়ামী লীগ কেউই কম যায়নি। বিএনপি নেতাদের ক্ষমতালিপ্সা এমনভাবে জাগরিত হয়েছে যে, তারা শুধু জামায়াতীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষান্ত হয়নি, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় জামায়াতের আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন জুগিয়েছে। যে রাজাকারদের বাংলার মাটিতে কুত্তা-বিলাইয়ের মতো জীবনযাপন করার কথা, সেই রাজাকারদের কপালে বিএনপি রাজটিকা পরিয়েছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় নানা শ্লোগান দিলেও তিনি একটিবারের জন্যও এর প্রতিবাদ করেননি। সর্বশেষ কাদের মোল্লার রায়ের বিষয়ে তারা নিশ্চুপ। ভাবখানা এমন— কিছুই হয়নি অথবা তারা কিছুই দেখেনি, অনেকটা কাকের মতো। প্রাকৃত কর্ম সম্পাদনের পর কাক যেমনটি মনে করে। ভাবতে অবাক লাগে, এই নির্লজ্জ-বেহায়ারাই আমাদের নেতা! এদের প্রতিষ্ঠাতাই নাকি নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রাম করে এদেশের স্বাধীনতা এনেছিল!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বহু আন্দোলন-সংগ্রামের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছি অথবা প্রত্যক্ষ করেছি। সর্বদা দেখেছি- যে আন্দোলনই হোক না কেন প্রথমদিকে বাম ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতারা সোচ্চার হয়। তারপর সাধারণ ছাত্ররা এর সাথে যোগ দেয়। পরবর্তীতে হয় ছাত্রলীগ অথবা ছাত্রদল এর সাথে যোগ দিয়ে অথবা বিরোধিতা করে পুরো আন্দোলনকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এই মহাসমাবেশ আমার দেখা ব্যতিক্রমী গণজমায়েত। যেখানে ছাত্রদল বা ছাত্রলীগের কোন কর্তৃত্ব নেই। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো যেখানে সাধারণত সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের অলিখিত শাসন চলে সেখানেও ছাত্রলীগের প্রভাব চোখে পড়েনি। কারণ যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামে যেতে হলে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বে যেতে হয়। কিন্তু এই মহাসমাবেশে সাধারণ ছাত্ররা স্বতঃস্ফূত যোগ দিয়েছে এবং তাদের যোগ দেয়ার হার ছিল চোখে পড়ার মতো। এই গণজমায়েতে মানুষের ঢল নেমেছিল। সাধারণত সরকার বা বিরোধী দলের কোন সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলে তার জন্য থাকে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, প্রচারণা, লিফলেট বিলি, টাকার খেলা। প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিতে বাস-ট্রাক বোঝাই করে মানুষ ভাড়া করে আনা হয়। কিন্তু শুক্রবারের সমাবেশ ছিল ব্যতিক্রম, যেখানে এসবের কোন আয়োজন ছিল না। যারা এই সমাবেশে যোগ দিয়েছেন, তারা একান্তই নিজের ইচ্ছায়, স্বতঃস্ফূর্ত। মনে হয়েছে, এই গণজমায়েতে শামিল হওয়া তাদের দায়িত্ব ছিল। যারা ৫২’র ভাষা আন্দোলন অথবা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দেখেনি, এই গণজমায়েত তাদেরকে বায়ান্ন-ঊনসত্তের গণজোয়ারের স্বাদ দিয়েছে।
পরিশেষে ব্লগার ও ফেসবুকে মাতাল তরুণরা মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে যে গণজমায়েত করতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে কায়রোর তাহরির স্কোয়ার ও দিল্লীর যন্তর-মন্তরকে হার মানিয়েছে; যা রাজনীতিবিদদের জন্য সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে প্রধান দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতি। এতদিন মানুষ অন্ধভাবে তাদের সমর্থন দিয়েছে। এই মহাসমাবেশ নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে যে, সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এখন আর কোন দলের লেজুড়বৃত্তি করতে চায় না। তারা মুক্তিযুদ্ধকে কোন দলের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে না। তারা আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বোঝে না। এদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের তারা রুখবেই, এমন দীপ্ত শপথে শাণিত হয়ে তারা রাজপথে নেমেছে। এতদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগ একক আধিপত্য ধরে রাখলেও প্রহসনমূলক রায় ও এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন প্রজম্মের এই সমাবেশের মাধ্যমে তার অবসান হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার দায়িত্ব এখন তরুণ প্রজন্মের কাঁধে। সেখানে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেই। তরুণ প্রজন্মের ডাকে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যেভাবে সাড়া দিয়েছে, নির্ঘুম রাত পার করছে, তা নতুন সূর্য উদয়ের আভাস দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, তৃতীয় শক্তির উত্থানের যে দাবি দীর্ঘদিন বাংলার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল, তা আর বেশি দূরে নয়।
++লেখক :শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,
[email protected]
