স্মরণ

মৃত্যুকে ভালোবেসেছিলেন যে কবি

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫৬
১৯৬৩’র ১১ ফেব্রুয়ারি। লন্ডনের ফিজরয় রোডের একটি ফ্ল্যাট। লন্ডনে সেবার একশ বছরের মধ্যে এত প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর পড়েনি। ঠাণ্ডায় পানির পাইপগুলো পর্যন্ত জমে গিয়েছিল। ঘরে দু’বছর আর ৯ মাসের দুটি শিশু অসুস্থ। তাদের মা ফ্লুতে আক্রান্ত। ভোর সাড়ে ৪টা গৃহকর্ত্রী ও বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত নার্স এসে দেখলেন ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। পরে আরেকজন গৃহকর্মীর সাহায্যে দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল রান্নাঘরের বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে বাড়ির কর্ত্রী মৃত পড়ে আছেন। তার মাথাটা গ্যাসের চুলোর ওপর রাখা। ঠিক এভাবেই খ্যাতির তুঙ্গে থাকা অবস্থায় বিংশ শতাব্দীর একজন শক্তিশালী প্রথাবিরোধী কবি প্রতিভা ও লেখকের জীবনাবশান ঘটে। তার নাম সিলভিয়া প্লাথ। তখন বয়স ৩১। প্লাথ জীবনে কয়েকবার আত্মহননের চেষ্টা করেছেন। শৈশব ও বয়স্ক জীবনের অনেকটা সময় তিনি ডিপ্রেশনে ভুগেছেন। ১৯৫৩ সালে একবার মায়ের একগাদা ঘুমের বড়ি খেয়ে তিনি মৃত্যুর স্বাদ নিতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর ৮ মাস আগে তিনি একটি কার অ্যাকসিডেন্টের শিকার হন। সে ঘটনাকেও তিনি তার অন্যতম আত্মহত্যা প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বস্তুত সিলভিয়া প্লাথের (২৭ অক্টোবর ১৯৩২-১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩) পুরো লেখক সত্তা জুড়ে ব্যপ্ত হয়ে আছে মৃত্যু চেতনা ও মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষার আভাস। তবে তিনি মৃত্যুকে ধ্বংস নয়, সৃষ্টি ও শৈল্পিক ক্ষমতা উন্মেষের প্রেরণা হিসেবে দেখেছিলেন। শৈশবে (মাত্র ৮ বছর বয়সে) তাকে ছেড়ে স্নেহশীল পিতার যার প্রতি তিনি ছিলেন খুবই অনুরক্ত তার চলে যাওয়াকে তিনি জীবনভর তার কষ্ট যন্ত্রণা ভোগের জন্য দায়ী বলে মনে করতেন। প্লাথের চূড়ান্ত সফল আত্মবিনাশ প্রচেষ্টার কয়েক মাস পরে প্রকাশিত Lady Lazarus কবিতার কয়েকটি পংক্তি এরকম Dying/ Is an art, like everything else/ I do it exceptionally well. সিলভিয়া প্লাথ জার্মান পিতা ও অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকা মায়ের ঘরে বোস্টনের জ্যামাইকা প্লেইনে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা Dtto Plath (১৮৮৫-১৯৪০) ও মা Aurelia Schobor Plath (১৯০৬-৯৪)। তাদের ছিল মধ্যবিত্ত পরিবার। ৮ বছর বয়সে প্লাথের লেখা প্রথম কবিতা বোস্টন হেরাল্ডের শিশু বিভাগে ছাপা হয়। কবিতা রচনা ছাড়াও শৈশবে ছবি আঁকতেও তার ভাল হাত ছিল। এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি ব্যক্তিকে তার অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ ও নিপুণভাবে পরিচালনা করতে জানতে হবে। এমনকি সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা, যেমন পাগলামি, অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করা এসবকেও। তাকে এসব অভিজ্ঞতাকে পরিচালনা করতে হবে একটি অবহিত ও বুদ্ধিদীপ্ত মননে’। তিনি একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দুই সন্তান ফ্রিডা ও নিকোলাসকে নিয়ে আর্থিক অনটন ও দুঃখকষ্টের মধ্যে বসবাস করতে থাকেন যার এক পর্যায়ে আত্মহনন করে জীবনের সমাপ্তি টানেন। মৃত্যুর আগেও তিনি কবিতা লেখা চালিয়ে যান। সন্তানরা ঘুম থেকে ওঠার আগে ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত তিনি লেখালেখি করতেন। সিলভিয়া প্লাথ confessional বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার ঘরানাকে এগিয়ে নিতে অবদান রেখেছেন। এক্ষেত্রে তিনি কবি রবার্ট লাওয়েল, অ্যান সেক্সটন (প্লাথের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী) ও জন বেরিম্যানকে সহযাত্রী হিসেবে পেয়েছেন। প্লাথ তার দু’টি কবিতা সংগ্রহের জন্য সমধিক পরিচিত The Colossus and Otha Prems এবং Ariel। ১৯৮২তে তাকে কবিতার জন্য মরণোত্তর পুলিত্জার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার আধা আত্মজৈবনিক উপন্যাস The Bell Iav তার মৃত্যুর সামান্য আগে প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি উল্লেখযোগ্য শিশুসাহিত্যও রচনা করেছেন। আজ তার প্রয়াণের ৫০ বছর পূর্তিতে এই মহান কবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। ++ লেখক : সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন